পৃথিবীর ভবিষ্যৎ: ১০ হাজার থেকে ১০০ কোটি বছর পর মানব সভ্যতা ও গ্রহের পরিবর্তন!

পৃথিবীর ভবিষ্যৎ: ১০ হাজার থেকে ১০০ কোটি বছর পর মানব সভ্যতা ও গ্রহের পরিবর্তন!

পৃথিবীর ভবিষ্যৎ: ১০ হাজার থেকে ১০০ কোটি বছর পর মানব সভ্যতা ও গ্রহের পরিবর্তন!

বন্ধুরা, আপনারা হয়তো এইটা জানেন না যে, আমাদের মানব সমাজ যখন ১০ হাজার বছর ছুঁয়ে ফেলবে, তখন আমাদের এক বিশাল বড় সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। আর এই সমস্যা বলতে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সুনামি কিংবা ভূমিকম্প নয়, বরং সাধারণ একটি ম্যাথামেটিক্যাল প্রবলেমের জন্য হবে। হ্যাঁ, আপনারা ঠিকই শুনেছেন! কারণ আমরা যখন ১০ হাজার বছর ছুঁয়ে ফেলব, তখন আমাদের প্রতিটা বছর রিপ্রেজেন্ট করতে চারটি ডিজিট নয়, বরং পাঁচখানা ডিজিটের প্রয়োজন হবে। এবার সমস্যাটা হচ্ছে যে, যত কম্পিউটার রয়েছে এবং তার সঙ্গে সঙ্গে ছোট যত সব ডিভাইস রয়েছে, সবগুলি বছরকে রিপ্রেজেন্ট করবার জন্য কেবল চারটি ডিজিট কোডিং ব্যবহার করে। এবার এই ১০ হাজার বছরে আরেকটি এক্সট্রা ডিজিট আসার কারণে প্রতিটা ইলেকট্রনিক ডিভাইস যেখানে বছর রিপ্রেজেন্ট করা হয়, সেগুলোর কোডিং চেঞ্জ করতে হবে। আর বৈজ্ঞানিক ভাষায় এই প্রবলেমটাকে 'ডেকামিলেনিয়াম বাগ' (Decamillennium Bug) বলা হয়।

তবে এত গেল একটি সাধারণ প্রবলেম, যা পৃথিবীর ১০ হাজার বছর পূর্ণ হলে দেখব। কিন্তু তার সাথে সাথে এই পৃথিবীতে কী পরিবর্তন হবে ১০ হাজার বছরে? চলুন, আজকে 'অদ্ভুত দশ'-এর এই ভিডিওটিতে সেই সকল প্রশ্নেরই উত্তর জানা যাক।

১. ১০ হাজার বছর পর: জেনেটিক পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক বিস্ময়

১০ হাজার বছর আসতে আসতে মানুষের মধ্যে থাকা জেনেটিক ডিফারেন্স, যেমন আফ্রিকার লোকেদের গায়ের রং কালো, আবার অন্যদিকে আমেরিকার লোকের গায়ের রং ফর্সা বা তাদের হেয়ার কালার আলাদা, এই সকল ডিফারেন্স বা স্পেশালিটি তখন আর দেখা যাবে না। কারণ এই সকল ডিফারেন্স বা স্পেশালিটি আমাদের ভবিষ্যতের জেনারেশনে সমান ভাগে ভাগ হয়ে যাবে।

আর ৫০ হাজার বছর আসতে আসতে পৃথিবীতে আরেকবার আইস এজ (Ice Age) ফিরে আসবে। মানে, পুরো পৃথিবী সম্পূর্ণ বরফে ঢেকে যাবে। আর ঠিক এই এক রকম ঘটনা আজ থেকে প্রায় কয়েক লক্ষ বছর আগে ঘটেছিল এই পৃথিবীতেই। নায়াগ্রা ফলস (Niagara Falls), যেটাকে আমরা বিশ্বের সবথেকে সুন্দরতম জলপ্রপাত হিসাবে জানি, সেটাও ১০ হাজার বছরের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। আর এত ঘটনা এবং এত বছর সময় কেটে যাওয়ার পর, পৃথিবীতে একদিনের ডিউরেশন কেবল এক সেকেন্ড বাড়বে। মানে, পৃথিবী সূর্যকে একটি পুরো রাউন্ড ঘুরতে এক সেকেন্ড সময় বেশি নেবে।

২. ৫ লক্ষ বছর পর: গ্রহাণুর হুমকি ও আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ

আজ থেকে ৫ লক্ষ বছর পর একটি ১ কিলোমিটারের থেকে বেশি বড় ডায়ামিটার যুক্ত গ্রহাণু (Asteroid) পৃথিবীর সংস্পর্শে আসবে। কিন্তু এটি পৃথিবীর সঙ্গে যে ধাক্কা খাবে, এটা বলা যেতে পারে না। কারণ এতদিনে আমাদের মানব সমাজ এমন কোনো টেকনোলজি নিশ্চয়ই বানিয়ে ফেলবে, যেটা পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসা কোনো অ্যাস্ট্রয়েডের হাত থেকে আমাদের বাঁচিয়ে ফেলবে। কিন্তু যদি এই অ্যাস্ট্রয়েড পৃথিবীর সঙ্গে ধাক্কা লাগে, তবে যেখানে সেটি ধাক্কা লাগবে, তার প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত সবকিছু ধূলিসাৎ হয়ে যাবে, তাও মাত্র এক সেকেন্ডের মধ্যে।

এবার যদি এই ভয়ানক পরিস্থিতি থেকে আমরা বেঁচেও যাই, তবে তার থেকে ঠিক ১০ লক্ষ বছর পর আমাদের মুখোমুখি হতে হবে এক বিশাল বড় আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণের (Volcanic Eruption) সামনে। এবার আপনি হয়তো এটাই ভাবছেন যে, এর থেকে পৃথিবীর সঙ্গে অ্যাস্ট্রয়েডের ধাক্কা লাগা পৃথিবীর জন্য অনেক বেশি ভয়ানক হবে। কিন্তু আপনাদেরকে জানিয়ে দিচ্ছি, যদি কোনো সুপার ভলকানো (Supervolcano) এই পৃথিবীতে হয়, তবে এই পৃথিবীর ৩২ হাজার কিউবিক কিলোমিটার পর্যন্ত ভলকানিক ইরপশন থেকে কালো ধোঁয়া ছেয়ে যাবে, যেটা আমাদের পৃথিবীর ওপর একটি মোটা মেঘের চাদর বানিয়ে দেবে। যেটা পৃথিবীর মধ্যে থাকা গরমকে না তো বাইরে যেতে দেবে এবং না তো পৃথিবীর বাইরে থেকে আসা কোনো হিট ভেতরে ঢুকতে দেবে। যার ফলে এই পরিস্থিতিতে আমাদের মানব সমাজের বেঁচে থাকা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ঠিক এইরকম ঘটনা আজ থেকে প্রায় ৭০ হাজার বছর আগে এই পৃথিবীতে ঘটেছিল, যেটাকে 'টোবা ইরপশন' (Toba Eruption) নামে জানা গিয়েছে। এই দুর্ঘটনার ফলে পৃথিবীতে সেই সময় থাকা মানব সমাজের চিহ্ন মুছে গিয়েছিল।

৩. ১০ লক্ষ বছর পর: মহাকাশে মানব বসতি ও বিবর্তিত মানবজাতি

আপনারা হয়তো বিটেলজুস (Betelgeuse) সম্বন্ধে কিছু না কিছু শুনেছেন। যদি এই গ্রহ সম্বন্ধে জানতে চান, তবে নিশ্চয়ই কমেন্ট করবেন। এই নিয়ে না হয় একটি ডিটেলস ভিডিওই বানাবো। সে যাই হোক, ১০ লক্ষ বছর পর এই গ্রহটি এক্সপ্লোড হয়ে একটি সুপারনোভা এক্সপ্লোশন (Supernova Explosion) তৈরি করবে, যেটা আমরা দিনের বেলাতে নিজেদের স্বচক্ষে দেখতে পারব।

আজ থেকে ২০ লক্ষ বছর পর মানুষ ততদিন নিজেকে এতটা অ্যাডভান্স টেকনোলজি নিয়ে ডেভেলপড করে ফেলবে যে, তারা পুরো সোলার সিস্টেমের বিভিন্ন গ্রহে নিজেদের বসতি তৈরি করতে সক্ষম হয়ে যাবে, যাতে আমরা শুধু পৃথিবী আর মঙ্গল গ্রহের উপর ডিপেন্ডেড না থাকি। এবার পৃথিবীর বাইরে অন্য গ্রহে বসবাস করবার ফলে, যেকোনো স্পেসিফিক গ্রহে যেকোনো অ্যাটমোস্ফিয়ারের সঙ্গে নিজেদেরকে মানিয়ে নেওয়ার জন্য, শরীরের বায়োলজিক্যাল দিকটা অনেকটা পরিবর্তন করে ফেলবে এই মানব সভ্যতা। এর ফলে প্রতিটা প্ল্যানেটে থাকা মানুষদের দেখতে একই রকম নয়, বরং আলাদা আলাদা দেখতে হবে।

৪. ১ কোটি থেকে ২৫ কোটি বছর পর: মহাদেশের পরিবর্তন ও নতুন পর্বতমালা

১ কোটি বছর পর ইস্টার্ন আফ্রিকার একটি বিশাল বড় অংশ টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার কারণে দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাবে। ৫ কোটি বছর পর আফ্রিকা মহাদেশ ইউরেশিয়ার (Eurasia) সঙ্গে জুড়ে যাবে, যার ফলে এর মাঝখানে থাকা সমুদ্রের অংশ মুছে যাবে। এবং এই দুটি মহাদেশে জুড়ে যাওয়ার কারণে একটি নতুন পর্বতমালার সৃষ্টি হবে। এবং অনুমান করা হয় যে, এই পর্বতমালাটি মাউন্ট এভারেস্টের থেকে অনেক বেশি লম্বা হবে। মহাকাশে থাকা মঙ্গল গ্রহটি ততদিনে চাঁদের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে যাবে। ফলে মঙ্গল গ্রহ কিছু টুকরোতে ভেঙে গিয়ে শনি গ্রহের চারিপাশে থাকা রিংয়ের মতন নিজেরও একটি রিং তৈরি করে ফেলবে।

১০ কোটি বছর পর এমনটা হতে পারে যে, পৃথিবীকে এমন কোনো অ্যাস্ট্রয়েডের মুখোমুখি হতে হবে, যেরকম অ্যাস্ট্রয়েড ডাইনোসরদের অস্তিত্ব মেটানোর জন্য যথেষ্ট ছিল। ২৫ কোটি বছর পর পৃথিবীতে থাকা সব কন্টিনেন্ট, যেমন এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়া, একসঙ্গে মিলে গিয়ে কেবল একটি মাত্র কন্টিনেন্ট বানিয়ে ফেলবে। এমনটা অতীতেও হয়েছিল, তখন পৃথিবীর ওই ফর্মটাকে প্যানজিয়া (Pangaea) বলা হতো। এবং ভবিষ্যতে যখন এমনটা হবে, তখন সেটাকে 'প্যানজিয়া আলটিমা' (Pangaea Ultima) বলা হবে। এইরকমটা কয়েক কোটি বছর পরে হয়ে থাকে এবং তার কয়েক কোটি বছর পর সেটা আবার আলাদাও হয়ে যায়। অর্থাৎ, মহাদেশগুলি আবারও আলাদা হয়ে যাবে, ঠিক যেমন এখন প্রতিটা মহাদেশ আলাদা আলাদা ভাবে বিভক্ত রয়েছে।

৫. ৭০ কোটি থেকে ১০০ কোটি বছর পর: মহাজাগতিক ঘটনা ও সূর্যের তেজ

৭০ কোটি বছর পর মহাকাশে আমাদের থেকে সাড়ে ৬ হাজার আলোকবর্ষ দূরে একটি জিআরবি (GRB) নামে গামা রে বিস্ফোরণ (Gamma-Ray Burst) হবে। এবং যদি এই বিস্ফোরণের রেশ আমাদের পৃথিবী অব্দি চলে আসে, তবে আমাদের পৃথিবীর ওজন লেয়ার (Ozone Layer) সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়ে আমাদের মানব সমাজের চিহ্ন সারা জীবনের জন্য মুছে দেবে।

এই সময় চাঁদ আমাদের পৃথিবী থেকে এতটা দূরে পৌঁছে যাবে যে, সূর্যগ্রহণের (Solar Eclipse) মতন ঘটনা আমাদের দেখা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। এই সময় সূর্যের আলোর তেজ আমাদের পৃথিবীতে এতটাই তির্যক হয়ে যাবে যে, আমাদের পৃথিবীর মাটির তলায় থাকা টেকটোনিক প্লেটের মুভমেন্টগুলোকে আটকানোর ক্ষমতা রাখবে।

৮০ কোটি বছর পর পৃথিবীর কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা এতটাই কমে যাবে যে, গাছপালা কোনোভাবে সালোকসংশ্লেষণ (Photosynthesis) করতে পারবে না। অর্থাৎ, গাছপালার খাদ্যই থাকবে না। আর ১০০ কোটি বছর পর সূর্যের উজ্জ্বলতা (Luminosity) ১০ শতাংশ বেড়ে যাবে, যার ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। পৃথিবীতে থাকা যতগুলি মহাসাগর ২০২১ সালে মানে এখনো রয়েছে, সেগুলো ততদিনে সম্পূর্ণ শুকিয়ে যাবে। এবং পৃথিবীতে যদি কোনো জল পাওয়া যায়, তবে সেটা সাউথ পোলেই পাওয়া যেতে পারে।

৬. মানব সভ্যতার টিকে থাকা: টাইপ টু সিভিলাইজেশন

কিন্তু আমাদের এটাও মাথায় রাখতে হবে যে, ১ বিলিয়ন বছর পর আমরা টেকনোলজিক্যাল দিক থেকে এতটাই অ্যাডভান্স হয়ে যাবো যে, আমরা এতদিন 'টাইপ টু সিভিলাইজেশন' (Type II Civilization) গঠন করে ফেলব। এমন সময় আমরা সূর্যের মতো নক্ষত্রের চারিদিকে একটি ডাইসন স্ফিয়ারের (Dyson Sphere) নির্মাণ করে ফেলব, যেটার সাহায্যে সূর্য থেকে বেরোনো সমস্ত রশ্মি আমাদের নিজের ইচ্ছা মতন ব্যবহার করতে পারব। এই সময় মহাকাশে থাকা অ্যাস্ট্রয়েডের মধ্যে থেকে মিনারেলস নিয়ে পৃথিবীতে আসা আমাদের কাছে খুবই সহজ একটা ব্যাপার হবে। এবার বাই চান্স যদি এতদিনে পৃথিবী মানুষের থাকার জন্য না থাকে, তবুও আমরা আমাদের সোলার সিস্টেমে থাকা অন্যান্য গ্রহগুলোকে আমাদের বসবাস করার মতন যোগ্য করে নিতে পারব, যার ফলে মানব সভ্যতা এত প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেও শেষ হবে না।

উপসংহার

আপনারা যদি পরবর্তী ভিডিওতে সময়ের পেছনে যেতে চান, তবে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন। এবং আপনাদের যদি ভিডিওটি ভালো লেগে থাকে, তাহলে অবশ্যই লাইক করবেন, বন্ধুদের সাথে শেয়ার করবেন। পাশাপাশি 'বাংলাকথা ' চ্যানেলটিতে নতুন হলে অবশ্যই সাবস্ক্রাইব করে বেল আইকনটিতে প্রেস করে নেবেন, এরকম ইন্টারেস্টিং ভিডিও সবার আগে দেখতে।

কীওয়ার্ডস: পৃথিবীর ভবিষ্যৎ, মানব সভ্যতা, ডেকামিলেনিয়াম বাগ, জেনেটিক পরিবর্তন, আইস এজ, নায়াগ্রা ফলস, গ্রহাণু, আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ, টোবা ইরপশন, বিটেলজুস, সুপারনোভা, মহাকাশে বসতি, টেকটোনিক প্লেট, মহাদেশের পরিবর্তন, প্যানজিয়া, প্যানজিয়া আলটিমা, গামা রে বিস্ফোরণ, ওজন স্তর, সূর্যগ্রহণ, কার্বন ডাই অক্সাইড, সূর্যের উজ্জ্বলতা, টাইপ টু সিভিলাইজেশন, ডাইসন স্ফিয়ার, সোলার সিস্টেম, প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

নবীনতর পূর্বতন

نموذج الاتصال