মহাকাশের অজানা রহস্য: হারিয়ে যাওয়া নভোচারী ও লাইকার মর্মান্তিক গল্প!

 

এই মহিলাটি মহাকাশে হারিয়ে যায়, তারপর তার সাথে কি হয়েছিল  What Happened to the Lost Woman in Space

মহাকাশের অজানা রহস্য: হারিয়ে যাওয়া নভোচারী ও লাইকার মর্মান্তিক গল্প!

বন্ধুরা, আমরা প্রত্যেকেই রহস্যময় এবং অদ্ভুত রকমের ভিডিও দেখতে ভালোবাসি। মহাকাশ সবসময়ই আমাদের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে। আমরা তো এটা প্রত্যেকেই জানি যে, মহাকাশে সর্বপ্রথম প্রাণী হিসেবে পাঠানো হয়েছিল লাইকা নামের একটি কুকুরকে। তার মর্মান্তিক ঘটনা সম্বন্ধে আমরা প্রায় সকলেই জানি। এছাড়াও পাঠানো হয়েছিল আলবার্ট নামের একটি বাঁদরকে, কিন্তু তার গল্পটাও খুব সুখকর নয়। আসলে, মানুষকে মহাকাশে পাঠানোর আগে মহাকাশে পাঠানো হয়েছিল বহু প্রাণীকে। কিন্তু আপনারা কি কখনো মহাকাশে কোনো মানুষের হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা শুনেছেন? সোভিয়েত ইউনিয়ন অনেক নতুন ও শিক্ষানবিশ মানুষদের মহাকাশে পাঠিয়েছিল, কিন্তু আমরা প্রায় সকলেই জানি যে, ইউরি গ্যাগারিন প্রথম ব্যক্তি ছিলেন যিনি প্রথম মহাকাশে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু এনার সম্পর্কে আমরা খুব কম মানুষই জানি।

তবে যাই হোক, আজকের পোস্টে আলোচনা করব এমন এক মহিলাকে নিয়ে যিনি মহাকাশে হারিয়ে গিয়েছিলেন। এছাড়াও আমরা লাইকা সম্পর্কে কিছু আলোচনা করব। তো চলুন, বেশি দেরি না করে পোস্টটিকে শুরু করা যাক!

মহাকাশের গোপনীয়তা: হারিয়ে যাওয়া নভোচারীর রহস্য

মহাকাশ সম্বন্ধে বিভিন্ন খারাপ ঘটনা আমাদের সামনে এর আগেও এসেছে। আমেরিকা একবার বেশ কিছু মানুষকে একত্রিত করে বলেছিল যে, তারা এমন একটি পদ্ধতি তৈরি করবে যাতে তারাই সবার আগে চাঁদে পৌঁছাবে। কিন্তু সেগুলোর পেছনে বহু রহস্য লুকিয়ে রয়েছে, যেগুলো আমাদের কাছে অজানা হয়ে আছে। এছাড়াও মহাকাশ সম্পর্কিত অনেক দুর্ঘটনার কথা আমরা এর আগেও শুনেছি। আর এখন এরকমই একটি রহস্যের কথা আজকে আপনাদেরকে বলব।

এই ঘটনাটি সকলের সামনে প্রথম তুলে ধরেছিল ইতালিতে বসবাস করা দুই ভাই – তাদের নাম ছিল জুডিকা (Judica) এবং কর্ডিগলিয়া গ্রিয়া (Cordiglia brothers)। এরা দুজনেই রেডিও অপারেটরের কাজ করত। আর প্রায় সকলেই জানি যে, রেডিও সিগন্যাল পৃথিবীর বাইরে অনেক দূর পর্যন্ত পাঠানো যায়। আর এই দুইজন ভাই অনেকদিন ধরেই এই রেডিওর সাথে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু তারা কখনোই রেডিও সিগন্যালের দ্বারা বিশেষ কিছু খুঁজে পাননি। কিন্তু ১৯৬৩ সালের নভেম্বর মাসে তাদের সাথে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটে।

তারা একটি অদ্ভুত রেডিও সিগন্যাল খুঁজে পায়, যেটা পৃথিবীর বাইরে থেকে এসেছিল। তারা এই সিগন্যালটির অডিও রেকর্ড করেন এবং পরে অডিওটা ভালোভাবে শুনে রীতিমতো অবাক হয়ে যান। আসলে এই সিগন্যালটাতে একজন মহিলার কণ্ঠস্বর ছিল। তিনি অত্যন্ত ভয় পেয়েছিলেন এবং ব্যথায় কাতরাচ্ছিলেন। সম্ভবত তিনি পৃথিবীতে ফেরত আসার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন এবং সাহায্যের জন্য চিৎকার করছিলেন। এই সিগন্যালটা যে আসল ছিল, তাতে কোনো রকম সন্দেহ ছিল না তাদের কাছে।

বহু মানুষ মনে করেন যে, তিনি সেই মহিলা, যাকে সর্বপ্রথম মহাকাশে পাঠানো হয়েছিল। এটাও মনে করা হয় যে, তিনি সফলভাবে মহাকাশে পৌঁছেও গিয়েছিলেন। এ কথাটা সত্যি হলেও, তার পৃথিবীতে ফিরে আসার সময় তাকে বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। আসলে তার মহাকাশযান বা ক্যাপসুলটির কুলিং সিস্টেম খারাপ হয়ে গিয়েছিল, ঠিক এই একই রকম ঘটনা ঘটেছিল লাইকার সাথেও। আর দুর্ভাগ্যবশত ক্যাপসুলটির ভেতরে আগুন লেগে গিয়েছিল, আর ওই মহিলাটি শেষ পর্যন্ত দম বন্ধ হয়ে মারা যান।

এই দুই ভাইকে তাদের কাজের জন্য সম্মানিত করা হয় এবং তাদেরকে নাসা থেকেও ডাকা হয়। এবং নাসাও তাদেরকে পুরস্কৃত করে। যে রেকর্ডটি এই দুই ভাই পেয়েছিলেন, সেটা সোভিয়েত ইউনিয়ন সময়কার একটি গোপনীয় মিশন ছিল। এই মিশনের নাম ছিল 'ভাস্কর প্রোগ্রাম' (Vostok Program)। এই মহাকাশ যাত্রা ১৯৬০ দশকে করা হয়েছিল এবং এই মহাকাশ যাত্রা ভীষণভাবে অসফল হয়েছিল। যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের এই অসফলতার কথা জানাতে চায়নি, তখন তারা এই প্রোগ্রামের সমস্ত তথ্য এবং প্রমাণ নষ্ট করে ফেলে। মানে, আমরা কখনোই জানতে পারব না যে, আসলেই ওই মহিলা কে ছিলেন। তবে এটা মনে করা হয়েছে যে, রেকর্ডে যে মহিলার কণ্ঠস্বর পাওয়া গেছে, তিনি মহাকাশ যাত্রী হিসাবে একা ছিলেন না, বরং তার সাথে অন্তত আরও দুইজন মহাকাশযাত্রী ছিলেন। আর এটা তো আমরা জানিই না যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন কতজনকে মহাকাশে পাঠিয়েছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো মহাকাশে এখনো ঘুরে চলেছে। হয়তো তারা সূর্যের খুব কাছে চলে গিয়েছে এবং এতদিনে তারা পুড়ে ছাই হয়ে মহাকাশে মিলিয়েও গেছে। যেমনটা এই রেকর্ডের চিৎকার শুনে মনে হয়েছিল যে, তাদের ক্যাপসুলে আগুন লেগে গেছে। অতএব, এতদিনে হয়তো সেই ক্যাপসুলটির অবশিষ্ট অংশ অন্য কোনো গ্রহ অথবা পৃথিবীর চারিদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এটা ভাবতে কতটা অবাক লাগে, তাই না যে, পৃথিবীতে আমরা মানুষেরা থাকি, সেই পৃথিবীর চারিদিকে মৃত মানুষের দল ঘুরে বেড়াচ্ছে!

লাইকার মর্মান্তিক মহাকাশ যাত্রা: এক নীরব বলিদান

এখন সেই কুকুরটার কথা বলব যাকে আগে মহাকাশে পাঠানো হয়েছিল। তাকে কিভাবে পাঠানো হয়েছিল? এবং তারপর কী ঘটেছিল তার সঙ্গে?

বর্তমানে আমাদের পৃথিবীতে মহাকাশযাত্রীদেরই আমরা সমস্ত ক্রেডিট দিয়ে থাকি যে, তাদের জন্যই আমরা মহাকাশের বিভিন্ন তথ্য জানতে পেরেছি। কিন্তু মানুষ তো অনেক পরে মহাকাশে গিয়েছে, তার আগে পাঠানো হয়েছিল অনেক প্রাণীকে। যার মধ্যে সবার আগে পাঠানো হয়েছিল লাইকা নামের কুকুরটিকে। ১৯৫৪ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের মস্কোতে লাইকা জন্মগ্রহণ করেছিল। লাইকা ছিল একটি সাধারণ রাস্তার কুকুর, আর নিজের কোনো মালিক ছিল না। কিন্তু 'স্পুটনিক এক্সপ্রেস প্রোগ্রাম'-এর একজন ইঞ্জিনিয়ার ১৯৫৫ সালে তাকে রাস্তা থেকে তুলে আনেন এবং তাকে স্পেস সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। 'স্পুটনিক ২' (Sputnik 2) মহাকাশযানের জন্য তাকে বাছাই করা হয়েছিল।

সোভিয়েত ইউনিয়ন পুরো পৃথিবীর সামনে নিজের শক্তি প্রদর্শন করতে চেয়েছিল বলেই এই মিশনটির ব্যবস্থা করেছিল খুবই তাড়াতাড়ি সময়ের মধ্যে। কিন্তু সেই সময় আমেরিকা এবং সোভিয়েতের মধ্যে ঠান্ডা যুদ্ধ চলছিল, যা আমরা 'কোল্ড ওয়ার' (Cold War) নামে জানি। অবশ্য এটাকে আমরা মহাকাশ যুদ্ধ বা 'স্পেস ওয়ার'ও বলতে পারি। কারণ তখন এই দুই মহাশক্তির মধ্যে লড়াই চলছিল যে, কারা আগে এই মহাকাশ সম্বন্ধে বেশি তথ্য জোগাড় করতে পারবে। আর এরকমই একটি পরীক্ষার জন্য স্পুটনিক ২ তৈরি করা হয়েছিল। তবে তারা এই রকেটে কোনো মানুষের বদলে একটি কুকুরকে পাঠানোর প্রস্তুতি নিয়েছিল। বিজ্ঞানীরা যেমন নতুন কিছু আবিষ্কারের জন্য ইঁদুর অথবা গিনিপিগ মারতে দ্বিধাবোধ করে না, ঠিক স্পুটনিক ১-এর সাফল্যের পর বিশ্বের দরবারে নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে একটি রাস্তার কুকুরকে বলি দেওয়ার জন্য রাশিয়া একবারও ভাবেনি।

মহাকাশযান স্পুটনিক ২-তে লাইকাকে বসিয়ে পৃথিবীর কক্ষপথে পাঠানোর কথা হয়েছিল। যাওয়ার জন্য সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও স্পুটনিক ২ এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে সেটা পৃথিবীতে ফিরে না আসে। আসলে একটি প্রাণীর ওপর ওজনহীনতার কী প্রভাব পড়তে পারে, সেটা সম্পর্কে তখনকার বিজ্ঞানীদের ধারণাই ছিল না। তাই সেটা জানবার জন্য একটি পরীক্ষামূলক ঘটনা হলো লাইকা এবং স্পুটনিক ২। আর ঠিক এই কারণেই লাইকার মৃত্যু নিশ্চিত ছিল।

১৯৫৭ সালের ৩রা ডিসেম্বর স্পুটনিক ২-কে পৃথিবী থেকে লঞ্চ করা হয়। স্পেস সুট পরবার পর মহাকাশযানে বসার পর লাইকা রীতিমতো ভয় পেয়ে যেতে শুরু করে। তার হৃদস্পন্দন স্বাভাবিকের থেকে অনেক বেশি হয়ে গিয়েছিল। এছাড়াও স্পুটনিক ২-তে লাইকার থাকার জায়গাটা অনেক ছোট ছিল। ভোর সাড়ে ৫টায় স্পুটনিক ২ লঞ্চ করা হয়। পৃথিবীর কক্ষপথে সুরক্ষিতভাবে পৌঁছে যায় লাইকা। কিন্তু তার হৃদস্পন্দন তখন ছিল প্রতি মিনিটে প্রায় ২৪০। আর এই হৃদস্পন্দনের চিত্র এখনো রাশিয়ার মিউজিয়ামে রাখা আছে।

যদিও রাশিয়া দাবি করেছিল, স্পুটনিক ২ লঞ্চ হওয়ার পর আরও সাতদিন লাইকা জীবিত ছিল। কিন্তু ২০০২ সালে স্পুটনিক ২ মিশনের সঙ্গে যুক্ত এক বিজ্ঞানী তাদের এই দাবিটা মিথ্যা বলেন এবং তিনি জানান, স্পুটনিক ২ পৃথিবীর কক্ষপথে পৌঁছানোর পরেই অতিরিক্ত উষ্ণতার কারণে লাইকার মৃত্যু হয়। তার আগেই অবশ্য রাশিয়া জানিয়েছিল যে, লাইকার খাবারে বিষ মিশিয়ে তাকে মেরে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু লাইকার মৃত্যু এতো সহজ এবং কষ্টহীন ছিল না।

আজ আমরা লাইকাকে নিয়ে বিভিন্ন গল্প পড়ি, ভিডিও দেখি। আর শুধু এইটুকুই মনে রাখি যে, পৃথিবীর প্রথম মহাকাশ যাত্রী ছিল একটি কুকুর, যার নাম লাইকা। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় পৌঁছানোর জন্য কী পরিমাণ যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছিল এই নিরীহ প্রাণীটিকে, সেটা আর কেউই মনে রাখে না। কিন্তু যার জন্য মানুষ মহাকাশে যাওয়ার সাহস পেল, তাকে এত সহজে ভুলে যাওয়া কখনই উচিত নয়।

উপসংহার

তো বন্ধুরা, আশা করি আজকের পোস্টটি আপনাদের ভালো লেগেছে। যদি ভালো লেগে থাকে, তবে অবশ্যই লাইক করে কমেন্ট করবেন এবং বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ারও করবেন। পাশাপাশি 'অদ্ভুত দশ' চ্যানেলে যদি নতুন হয়ে থাকেন, তবে অবশ্যই সাবস্ক্রাইব করে বেল আইকনটিতে প্রেস করে নেবেন, এরকমই ইন্টারেস্টিং ভিডিও সবার আগে দেখতে।

কীওয়ার্ডস: লাইকা, মহাকাশে প্রথম প্রাণী, হারিয়ে যাওয়া নভোচারী, সোভিয়েত ইউনিয়ন, মহাকাশ রহস্য, স্পুটনিক ২, ভাস্কর প্রোগ্রাম, জুডিকা-কর্ডিগলিয়া ভাই, রেডিও সিগন্যাল, মহাকাশ দুর্ঘটনা, কোল্ড ওয়ার, স্পেস ওয়ার, ইউরি গ্যাগারিন, মহাকাশ গবেষণা, অজানা ইতিহাস, মহাকাশ ভ্রমণ, কুকুর মহাকাশে।

নবীনতর পূর্বতন

نموذج الاتصال