বুর্জ খলিফার অজানা রহস্য: উচ্চতা কি সত্যিই কমছে?

 

বুর্জ খলিফার অজানা রহস্য: উচ্চতা কি সত্যিই কমছে?

বুর্জ খলিফার অজানা রহস্য: উচ্চতা কি সত্যিই কমছে?

বন্ধুরা, আমরা তো এটা প্রত্যেকেই জানি যে, বুর্জ খলিফা হলো বর্তমানের সবথেকে উঁচু বিল্ডিং। তার সাথে সাথে এটাকে পৃথিবীর সবথেকে আধুনিক বিল্ডিংও বলা যেতে পারে। কিন্তু আপনি কি এটা জানেন যে, বুর্জ খলিফার উচ্চতা দিন দিন কমে যাচ্ছে? যে উচ্চতা ২০২১ সালে এতটা ছিল, সেই উচ্চতা ২০২৭ সালে এতটা কমে যাবে, আর ২০৩৫ সাল আসতে আসতে এটা আরও ছোট হয়ে যাবে! আমি জানি, আপনাদের মধ্যে অনেকেই এই ফ্যাক্টটি জানতেন না। তবে চিন্তার কোনো কারণ নেই। আজকে 'অদ্ভুত দশ'-এর এই ভিডিওটিতে আমি বুর্জ খলিফা সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য আপনাদেরকে জানাতে চলেছি, যেগুলো আপনি এর আগে কখনো শোনেননি। তাই পোস্টটিকে শেষ পর্যন্ত অবশ্যই দেখবেন।

তো চলুন, বেশি দেরি না করে, আজকের পোস্টটিকে শুরু করা যাক!

১. বুর্জ খলিফার উচ্চতার রহস্য: নির্মাণ থেকে চূড়ান্ত রূপ

আপনারা হয়তো এটা জানেন যে, বুর্জ খলিফার যখন কনস্ট্রাকশনের কাজ চলছিল, তখন এই বিল্ডিংয়ের সম্পূর্ণ ডিজাইনও তৈরি হয়নি। মানে, সম্পূর্ণ ডিজাইন তৈরি হওয়ার আগেই কনস্ট্রাকশনের কাজ শুরু করে দেওয়া হয়েছিল। আর এটা হয়তো আপনারা জানেন যে, শুরুতে যখন বুর্জ খলিফার ডিজাইনিং এর কাজ চলছিল, তখন সেই সময় তাঁর উচ্চতা তাইপেই ১০১-এর (Taipei 101) থেকে ১০ মিটার উঁচু রাখা হয়েছিল। আর এমনটা রাখা হয়েছিল, কারণ সেই সময় পৃথিবীর সবথেকে উঁচু বিল্ডিং ছিল তাইপেই ১০১, যেটার উচ্চতা ছিল ৫০৮ মিটার। তখন দুবাইয়ের শেখের শুধুমাত্র উদ্দেশ্য ছিল পৃথিবীর সবথেকে উঁচু বিল্ডিং তৈরি করা। আর সেটা যদি পৃথিবীর সবথেকে উঁচু বিল্ডিং তাইপেই ১০১-এর থেকে মাত্র ১০ মিটার উঁচুও হয়, তাহলেও চলবে।

কিন্তু আর্কিটেকরা যখন এই কাজটি মনোযোগ দিয়ে করছিল, তখন তারা দেখে এই বিল্ডিং এতটাই মজবুত যে, এটা আরও অধিক উঁচুতে বানানো সম্ভব। এই বিষয়টি যখন দুবাইয়ের গভর্নমেন্ট জানতে পারে, তখন তারা অর্ডার দেয় এই বিল্ডিং যত উঁচু বানানো সম্ভব, ততটুকু উঁচু যেন বানানো হয়। সরকারের সম্মতি পাওয়ার পরেই বুর্জ খলিফা সর্বপ্রথম ৭২৫ মিটার পর্যন্ত উচ্চতায় বানানো হয়। তারপর এটাকে আরও বেশি আপগ্রেড করে ৮০০ মিটার পর্যন্ত উঁচু বানানো হয়, আর ফাইনালি এটাকে ৮২৮ মিটার পর্যন্ত উঁচু বানানো হয়েছিল। আর এর কারণ, বিল্ডিংয়ের কোর (Core) এবং বিল্ডিংয়ের সক্ষমতা দেখে এতটা উঁচু বানানো হয়েছিল।

২. নির্মাণ কৌশল ও ব্যবহৃত উপকরণ

এই বিল্ডিংটির জন্য যে কংক্রিট ব্যবহার করা হয়েছিল, সেটা ২৫টি আলাদা আলাদা জিনিস মিশিয়ে বানানো হয়েছিল। যাতে বুর্জ খলিফার একদম উপরের ফ্লোরগুলি পর্যন্ত লিকুইড ফরম্যাটেই এই কংক্রিটগুলোকে পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে। আর সেটা পৌঁছে যাওয়ার পরেই যেন সেটা খুবই দ্রুত সলিডে পরিবর্তন হতে পারে। কেননা এর আগে যে কংক্রিটগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল, সেটা বিল্ডিংয়ের একদম উপর পর্যন্ত যাওয়ার আগেই জমে যেত। এই জন্য এই কংক্রিট ২৫টি আলাদা আলাদা জিনিসের মিক্সিংয়ে করা হয়েছিল।

৩. শ্রমিকদের চ্যালেঞ্জ ও বিতর্ক

যখন এই বিল্ডিংটি ৭২৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু ছিল, তখন থেকেই এত উঁচুতে সাধারণ মানুষদের কাজ করানো খুবই কঠিন ব্যাপার হয়ে গিয়েছিল। কেননা বিল্ডিংয়ের উচ্চতা যত বাড়বে, ততই বাতাসের গতি বাড়তে থাকবে। তাই এতো উঁচুতে কাজ করানোর জন্য বিভিন্ন দেশ থেকে সাহসী এবং দক্ষ কিছু শ্রমিকদের এখানে কাজ করানোর জন্য নিয়োগ করা হয়, যারা অধিক উচ্চতাকেও বিন্দুমাত্র ভয় না পেয়ে এই কাজ করতে পারে। এই বিল্ডিংয়ের কনস্ট্রাকশনে অধিকাংশ শ্রমিকই বিভিন্ন ধরনের দেশ থেকে এসেছিল। তাই এদের ভাষাও সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। আর এই বিভিন্ন দেশ থেকে কাজ করতে আসা লোকেদের মধ্যে আমাদের ভারত ও বাংলাদেশের লোক বেশি ছিল। আর যেহেতু তাদের ভাষা সম্পূর্ণ আলাদা ছিল, তাই তারা একসাথে কাজ করবার জন্য ইশারার ব্যবহার করতো।

এসব কথা শোনার পর আপনাদের মনে একটা প্রশ্ন তো অবশ্যই জাগবে যে, এত বড় বিল্ডিং বানাতে কি শ্রমিকদের মৃত্যু ঘটেছিল? তবে আপনাদের জানিয়ে রাখি, আপনি এমন কোনো আর্টিকেল খুঁজে পাবেন না যেখানে লেখা আছে যে, বুর্জ খলিফা তৈরি করতে একজন লোকেরও মৃত্যু হয়েছিল। তবে একটি গোপন সূত্রে জানা যায় যে, বুর্জ খলিফা তৈরি করবার সময় চার জনের মৃত্যু হয়েছিল। আর এ কথা জনসমক্ষে না আসার কারণ হলো, যাতে বুর্জ খলিফার নাম খারাপ না হয়। তবে এই মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। দুবাইয়ের অফিসিয়াল নিউজের মতে, বুর্জ খলিফা তৈরি করতে মোট চারজনের মৃত্যু হয়েছিল।

এরপর যখন বুর্জ খলিফা কমপ্লিট হয়ে যায়, তখন ১০৮ তলা বিল্ডিং থেকে কেউ একজন লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। তারপর যখন ওই ব্যক্তির সম্পর্কে খোঁজ খবর নেওয়া হয়, তখন জানা যায় যে, ব্যক্তিটি ভারতীয় একজন নাগরিক ছিল। এই ব্যক্তিটি বুর্জ খলিফা থেকে কেন লাফ দিয়েছিল, সে সম্পর্কে দুটি তথ্য সামনে এসেছে। এর মধ্যে একটি তথ্যে বলা ছিল, ওই ব্যক্তিটি তাঁর স্ত্রীর সাথে ঝগড়া করে এমন ঘটনা ঘটিয়েছিল। আর দ্বিতীয় তথ্যে জানা যায় যে, সেই ব্যক্তিটি তাঁর স্ত্রীর সাথে ঝগড়া হওয়ার কারণে বুর্জ খলিফা থেকে লাফ দেননি, বরং তাঁর সাথে কাজ করা সহকর্মীদের সাথে ঝগড়া হওয়ার কারণে সে এমনটা করেছিল।

৪. অত্যাধুনিক গ্লাস টেকনোলজি

তবে যাই হোক, বুর্জ খলিফাকে সম্পূর্ণ বানানোর পর সময় আসে ওই বিল্ডিংয়ে কোন গ্লাস ব্যবহার করা হবে। বলা হয় যে, বুর্জ খলিফায় গ্লাস লাগানোর জন্য যে কোম্পানিকে হায়ার করা হয়েছিল, সেই কোম্পানিটি সম্পূর্ণ প্রোডাক্ট এবং ইকুয়িপমেন্ট শেষ হয়ে গিয়েছিল এই বিল্ডিংটিতে গ্লাস লাগাতে গিয়ে। কিন্তু তবুও গ্লাস লাগানোর কাজ শেষ হয়নি। এরপর সেই কোম্পানি অন্য একটি কোম্পানির সাথে যোগাযোগ করে।

নরমাল গ্লাস প্যানেল লাগানো হয়েছিল, যেটা লাগানোর পরে বুর্জ খলিফার তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি পর্যন্ত হয়ে যায়। কেননা এই গ্লাস সূর্য থেকে সম্পূর্ণ তাপমাত্রা বুর্জ খলিফার ভেতরে যাওয়ার থেকে আটকাতে পারছিল না। এরপর বুর্জ খলিফার ভেতরে গ্লাস লাগানোর জন্য যে কোম্পানির সাথে যোগাযোগ করা হয়েছিল, তারা বুর্জ খলিফার জন্য এমন এক ধরনের গ্লাস তৈরি করে, যে গ্লাসের দুটো লেয়ার ছিল। এর মধ্যে যে লেয়ারটি বুর্জ খলিফার বাইরে থাকবে, সেটার উপরে সিলভার কোটিং লাগানো হয়, যেটা সূর্যের ইউভি রে-কে গ্লাসে পড়ার সাথে সাথে তার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। আর এই গ্লাসের ভেতরের অংশের লেয়ারে টাইটানিয়ামের কোটিং ব্যবহার করা হয়েছিল, যেটা ইনফ্রারেড রে-কে আটকাতে সাহায্য করে। তারপর যখন এই গ্লাস বুর্জ খলিফায় লাগানো হয়, তখন বুর্জ খলিফার ভেতরের তাপমাত্রা একদম নরমাল ছিল। এরপর সম্পূর্ণ বুর্জ খলিফাতেই এই গ্লাসই ব্যবহার করা হয়েছিল।

৫. নিরাপত্তা ও বিদ্যুৎ ব্যবহার

বুর্জ খলিফাতে পৃথিবীর সব থেকে উঁচু অবজারভেশন ডেক রয়েছে, যেখানে দাঁড়িয়ে আপনি সম্পূর্ণ দুবাইকে দেখতে পাবেন। আর সেখানে থাকা দরজার মধ্যেও উইন্ড সেন্সর (Wind Sensor) লাগানো রয়েছে, যেটা নির্দেশ দেয় যে এখন দরজা খোলা উচিত হবে নাকি বন্ধ রাখা ঠিক হবে। কেননা যদি বাইরে প্রচুর পরিমাণে বাতাস চলতে থাকে, তাহলে সেখানে যে কেউই দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না। কারণ দুবাইতে প্রচুর গতিতে বাতাস চলতে থাকে এবং সেই বাতাসের সাথে অনেক ধুলোবালিও জড়িয়ে থাকে। আপনি জানলে অবাক হবেন যে, বুর্জ খলিফায় মোট ১৭০০০ দরজা রয়েছে।

আর যদি কোনোভাবে এই বিল্ডিংয়ে ইমার্জেন্সি সিচুয়েশন তৈরি হয়ে যায় বা কোথাও আগুন লেগে যায়, তাহলে এই বিল্ডিংয়ের প্রত্যেকটা ফ্লোরে একটা করে ইমার্জেন্সি চেম্বার বানানো হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে ইমার্জেন্সি লিফট। এই ইমার্জেন্সি চেম্বার বুর্জ খলিফার সব থেকে সেফ জায়গা। এই চেম্বারের মধ্যে যেকোনো ধরনের আগুন প্রবেশ করা বা ক্ষতিকর কোনো গ্যাস প্রবেশ করা একদমই সম্ভব নয়। কেননা বুর্জ খলিফা মানুষের সেফটির বিষয় নিয়ে সব থেকে বেশি মাথা ঘামিয়েছে। বুর্জ খলিফার উপরের অংশের তাপমাত্রা নিচের অংশের তাপমাত্রা থেকে প্রায় অনেক বেশি ঠান্ডা থাকে। আপনারা হয়তো সকলেই জানেন যে, বুর্জ খলিফার প্রত্যেকটি ফ্লোর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। তাছাড়াও এখানে অনেক লাইট রয়েছে, অনেক টেকনোলজিও রয়েছে। তো আপনাদের মধ্যে এই প্রশ্নটা নিশ্চয়ই আসবে যে, এই বুর্জ খলিফাতে মোট কত ওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়? এর উত্তর হলো, বুর্জ খলিফার বিল্ডিংয়ে প্রতিদিন মোট ৩৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হয়।

৬. বুর্জ খলিফার বিশ্ব রেকর্ডসমূহ

আপনারা হয়তো এটা সবাই জানেন, পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিল্ডিং বুর্জ খলিফার নামে অনেকগুলো ওয়ার্ল্ড রেকর্ড রয়েছে। এখন আমি আপনাদের বুর্জ খলিফার সম্পর্কে দশটি এমন রেকর্ড জানাবো, যেগুলোর মধ্যে হয়তো আপনি কিছু রেকর্ড ইতিমধ্যে জেনে ফেলেছেন, কিন্তু এর মধ্যেও কিছু এমন রেকর্ড রয়েছে, যেগুলো সম্পর্কে হয়তো আপনি ইতিপূর্বে কখনো শোনেননি।

১. বুর্জ খলিফা পৃথিবীর সব থেকে উঁচু ফ্রি-স্ট্যান্ডিং স্ট্রাকচার। ২. বুর্জ খলিফাতে পৃথিবীর সব থেকে বেশি ফ্লোর রয়েছে। বুর্জ খলিফাতে মোট ১৬৩টি ফ্লোর আছে, যার মধ্যে ৯টি ফ্লোর মেইনটেনেন্সের জন্য ব্যবহার করা হয়। ৩. পৃথিবীর সব থেকে বেশি অকুপায়েড ফ্লোর বুর্জ খলিফাতেই রয়েছে। ৪. পৃথিবীর সব থেকে বেশি অবজারভেশন ডেক যুক্ত বিল্ডিংই হলো বুর্জ খলিফা। ৫. পৃথিবীর সব থেকে লম্বা লিফট এই বুর্জ খলিফাতেই রয়েছে, যেখানে একটা লিফট ৫০৪ মিটার পর্যন্ত চলে। ৬. বুর্জ খলিফাতে পৃথিবীর সব থেকে লম্বা এলিভেটর সার্ভিস রয়েছে। ৭. পৃথিবীর সবথেকে উঁচু নাইট ক্লাব রয়েছে এই বুর্জ খলিফাতে। ৮. পৃথিবীর সবথেকে উঁচু রেস্টুরেন্ট বুর্জ খলিফাতেই রয়েছে। ৯. পৃথিবীর সবথেকে উঁচু ডিসপ্লে এই বুর্জ খলিফাতেই আছে, পাশাপাশি ফায়ার ওয়ার্কও সব থেকে উঁচুতে। ১০. পৃথিবীর সবথেকে বড় লাইট এবং সাউন্ড সোর্স এই বুর্জ খলিফার নামেই রয়েছে।

উপসংহার

তো বন্ধুরা, এই ছিল বুর্জ খলিফা সম্পর্কে দশটি এমন রেকর্ড, যেগুলো আপনার জানা প্রয়োজন ছিল। তবে বুর্জ খলিফার জন্য দুঃখের বিষয় এটাই যে, এই বিল্ডিংটি পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিল্ডিংয়ের তকমা হয়তো চিরদিন ধরে রাখতে পারবে না, কারণ আরও উঁচু বিল্ডিং তৈরির কাজ চলছে।

কীওয়ার্ডস: বুর্জ খলিফা, দুবাই, বিশ্বের সর্বোচ্চ বিল্ডিং, বুর্জ খলিফার উচ্চতা, আধুনিক স্থাপত্য, নির্মাণ রহস্য, তাইপেই ১০১, গ্লাস টেকনোলজি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ খরচ, বুর্জ খলিফার রেকর্ড, ওয়ার্ল্ড রেকর্ড, অবজারভেশন ডেক, ইমার্জেন্সি চেম্বার, লিফট, নাইট ক্লাব, রেস্টুরেন্ট, ফায়ার ওয়ার্ক, লাইট শো।

নবীনতর পূর্বতন

نموذج الاتصال