মেডিকেল অক্সিজেন, কুলার ও স্যালাইন: কিভাবে তৈরি হয় এই জরুরি সামগ্রীগুলো?
বন্ধুরা, আজকাল আমাদের কাছে একটা ধারণা খুবই স্পষ্ট। করোনার মতো মহামারীর তৃতীয় ঢেউ আমাদের দেশে এসে পড়েছে। আপনারা হয়তো এটাও জানেন যে, এটি প্রথম ঢেউয়ের থেকেও অনেক বেশি মাত্রায় আক্রমণ করছে, যার ফলে আগের বছরের তুলনায় এই বছর আমাদের দেশে অনেক বেশি মানুষ প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে আক্রান্ত হচ্ছেন। আর তার সঙ্গে বেড়ে চলেছে মৃত্যুর মিছিল। তবে শুধু করোনাই নয়, বরং বেহাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জেরে ভ্যাকসিন বা টিকা এবং হাসপাতালের বেড, ইত্যাদির বিশুদ্ধ অক্সিজেন এর অভাবেও বহু মানুষ মারা যাচ্ছেন।
তাই আজকে 'অদ্ভুত দশ'-এর এই ভিডিওটিতে আমি আপনাদের বলতে চলেছি যে, কিভাবে মেডিকেল অক্সিজেন সিলিন্ডার তৈরি করা হয়। তার পাশাপাশি গরম থেকে বাঁচার জন্য কিভাবে কুলার তৈরি করা হয় বা কিভাবে চিকিৎসা ব্যবস্থার অন্যতম উপকরণ স্যালাইন তৈরি করা হয়, সেটাও আজকের ভিডিওতে জানাবো। তাই ভিডিওটি সম্পূর্ণ দেখবার অনুরোধ রইলো।
১. কিভাবে তৈরি হয় মেডিকেল অক্সিজেন?
এই মুহূর্তে আমাদের দেশে সবথেকে চাহিদার বস্তু হলো মেডিকেল অক্সিজেন। মাত্র কয়েকদিনেই মেডিকেল অক্সিজেনের চাহিদা হঠাৎ করে বেড়ে গিয়েছে, যে কারণে পর্যাপ্ত অক্সিজেনের অভাব দেখা দিয়েছে। কিন্তু আপনারা হয়তো ভাবছেন, আমাদের পরিবেশের বায়ুমণ্ডলে প্রচুর পরিমাণে অক্সিজেন রয়েছে, তবে মেডিকেল অক্সিজেনের কি প্রয়োজন? প্রয়োজন আছে! কারণ বায়ুমণ্ডলে যে শুধু অক্সিজেন আছে, তা কিন্তু নয়। বায়ুমণ্ডলে রকম গ্যাস যেমন নাইট্রোজেন, হাইড্রোজেন, কার্বন ডাই অক্সাইড, অক্সিজেন ইত্যাদি একসঙ্গে মিলেমিশে আছে। যে কারণে বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেনকে বিশুদ্ধ অক্সিজেন বলা যায় না। কোন রোগীর শরীরে যখন হঠাৎ করে অক্সিজেন কমে যায়, তখন বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেন তার কোনো কাজেই লাগে না। তখন তার প্রয়োজন মেডিকেল অক্সিজেনের, কারণ এই অক্সিজেন অনেক বিশুদ্ধ এবং অন্যান্য কোন গ্যাস এর সঙ্গে মিশে থাকে না বললেই চলে।
আজ আমি আপনাদের দেখাবো কিভাবে বায়ুমণ্ডলে থাকা বাতাস থেকে অন্যান্য গ্যাস ফিল্টার করে অক্সিজেনকে শুদ্ধ করা হয়:
বায়ু সংগ্রহ ও প্রাথমিক ফিল্টারিং: প্রথমে বায়ুমণ্ডল থেকে অনেকটা বাতাস বা হাওয়াকে একটা জায়গায় জমা করা হয়। তারপর সেই বাতাসকে একটা ফিল্টারের মাধ্যমে চালনা করা হয়। এই প্রথম ফিল্টারটি বাতাসে থাকা ধুলোবালি এবং অন্যান্য বিষাক্ত পদার্থকে আলাদা করে দেয়।
কম্প্রেশন ও পিউরিফিকেশন: তারপর সেই বিশুদ্ধ বাতাসকে কম্প্রেসারের দ্বারা আটকে পিউরিফাই রুমে পাঠানো হয়। সেখান থেকে ওই বাতাস থেকে জল, কার্বন ডাই অক্সাইড এবং হাইড্রোকার্বনকে বাদ দেওয়া হয়।
তরলীকরণ: এরপর ওই বাতাসে অন্য যে সকল গ্যাসগুলো থাকে, সেগুলোকে তরলে পরিণত করা হয়। সেগুলোকে তরলে পরিণত করবার জন্য -১৭৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাতে জমা করে রাখা হয়।
ফ্র্যাকশনাল ডিস্টিলেশন: কিছুক্ষণ পরে ওই গ্যাস যখন তরল পদার্থে পরিণত হয়ে যাওয়ার পর আবার কম্প্রেশন প্রক্রিয়া চালু করা হয়, যেখানে ওই তরল বাতাসকে ডিস্টিলেশন কলামে ঢেলে ডিস্টিল করে দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়াকে ফ্র্যাকশনাল ডিস্টিলেশন বলা হয়। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে তবেই বিশুদ্ধ অক্সিজেন পাওয়া যায়।
সরবরাহ: তারপর ওই তরল অক্সিজেন, সিলিন্ডার বা ট্যাংকারের মাধ্যমে হাসপাতালে এবং রোগীদের কাছে সরবরাহ করা হয়।
২. মেডিকেল অক্সিজেন সিলিন্ডার তৈরির প্রক্রিয়া
এবার আমরা দেখে নেবো কিভাবে মেডিকেল অক্সিজেন সিলিন্ডার তৈরি করা হয়, আর তারপর দেখবো কিভাবে ওই সিলিন্ডারগুলোতে তরল অক্সিজেন ভর্তি করা হয়।
পাইপ কাটিং ও বটম তৈরি: প্রথমে একটি পুরো মোটা পাইপকে ধারালো কাটার যন্ত্র দিয়ে নির্দিষ্ট মাপে কেটে নেওয়া হয়। তারপর এই গোলাকার লোহার পাতকে মল্ড (ছাঁচ) এ ফেলে প্রায় ৮০০ চাপ সৃষ্টি করা হয়। এইভাবে বানানো হয় অক্সিজেন সিলিন্ডারের নিচের অংশ।
জোড়া লাগানো ও আকার দেওয়া: এরপর কেটে রাখা পাইপ আর ওই নিচের অংশকে একটি ওভারহিটিং চেম্বারে ঢুকিয়ে জোড়া লাগানো হয়। এরপর সিলিন্ডারের নিচের অংশকে অতিরিক্ত তাপ দিয়ে তার নির্দিষ্ট রূপ দেওয়া হয়।
সিলিং ও মজবুতকরণ: তারপর অন্য একটি শক্ত ধাতু ব্যবহার করে সিলিন্ডারের ধারগুলোকে সিল করবার মাধ্যমে সিলিন্ডার তৈরি করার কাজ সম্পূর্ণ হয়। কিন্তু এটা তখনও যথেষ্ট মজবুত হয় না। তাই সিলিন্ডারগুলোকে আবারও ৯০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় গরম করে একটি বিশেষ কেমিক্যাল সলিউশনের মধ্যে ৬ মিনিট পর্যন্ত ডুবিয়ে রাখা হয়। তারপর সেটিকে তুলে আবারো ২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় গরম করে আবারও কেমিক্যাল সলিউশনের মধ্যে ২ ঘন্টা ডুবিয়ে রাখা হয়। আর এভাবেই একটি মজবুত অক্সিজেন সিলিন্ডার তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়।
ভাল্ব লাগানো ও সরবরাহ: এরপর শুরু হয় সিলিন্ডারগুলোর মাথায় ভাল্ব লাগানোর কাজ। তবে তার আগে সিলিন্ডারগুলোর ভেতরে উচ্চচাপযুক্ত জল ভরে সেটাকে পরিষ্কার এবং জীবাণুমুক্ত করে নেওয়া হয়। এরপর সর্বশেষে সিলিন্ডারগুলোকে রং করে পাঠিয়ে দেওয়া হয় অক্সিজেন কারখানায়, যেখানে এই সিলিন্ডারে অক্সিজেন ভর্তি করা হয়।
৩. এয়ার কুলার কিভাবে তৈরি হয়?
স্বাভাবিকভাবে গ্রীষ্মকালে আমাদের সকলের পরিস্থিতি খুব খারাপ হয়ে যায়, তাই বাড়িতে একটি এয়ার কুলার থাকলে এই অবস্থা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। আর বলতে গেলে গরম প্রধান দেশগুলোতে এই কুলারের চাহিদা অনেকটাই বেশি। তাই আজ আমি আপনাদেরকে দেখাবো যে কিভাবে এটি তৈরি করা হয়।
ধাতব সিট্ প্রক্রিয়াকরণ: কুলার তৈরি করবার জন্য সবার প্রথমে ধাতব সিট্ কারখানাতে নিয়ে আসা হয়। ওই সিট্গুলোকে কুলারের আকারে কেটে নেওয়া হয় এবং মেশিনের সাহায্যে এই সিট্গুলোকে ভাঁজ করে নেওয়া হয়। তারপর মল্ডিং মেশিনের সাহায্যে কেটে রাখা সিটগুলোতে ডিজাইন করা হয়।
জালি ও পাইপ স্থাপন: আপনারা নিশ্চয়ই এটা দেখে থাকবেন যে কুলারের গায়ে একটা জালি থাকে। এই জালি তৈরি হয়ে যাওয়ার পর এর উপর ছোট ছোট ছিদ্র করে দেওয়া হয়, যাতে কুলারটি যতটা সম্ভব ঠান্ডা হাওয়া দিতে পারে। আর হাওয়াকে ঠাণ্ডা করে দেওয়ার জন্য এদের মধ্যে তামার পাইপ লাগানো হয়।
ঝালাই ও পেইন্টিং: এই সমস্ত প্রক্রিয়া মজবুত বানানোর জন্য এবং সমস্যা সমাধানের জন্য ঝালাই করা হয়। এরপর ঝালাই করে কুলারের প্রান্তগুলোকে ভোঁতা করা হয়। তারপর ওই সমস্ত অংশগুলি পেন্টিং রুমে নিয়ে গিয়ে স্প্রে কালারের সাহায্যে এদের রং করা হয়। তারপর অন্য একটি ঘরে এদের শোকানোর জন্য রেখে দেওয়া হয়।
মোটর ও যন্ত্রাংশ সংযোজন: যখন এই শোকানোর জন্য রেখে দেওয়া হয়, তখন কারখানায় অন্য একটি সেক্টরে কুলারের মোটর বানানোর কাজ শুরু করে দেওয়া হয়। মোটর বানানোর যন্ত্রাংশ অন্য কারখানা থেকে এখানে নিয়ে আসা হয়। যন্ত্রাংশগুলি নিয়ে আসার পর এদের মোটরের সাহায্যে সঠিকভাবে জুড়ে দেওয়া হয়। তারপর এই মোটরগুলোকে সম্পূর্ণ চেকিং করা হয়। এরপর মোটরগুলোতে তার লাগিয়ে কুলারের সাথে ফিট করা হয় এবং কুলারের বাকি যন্ত্রাংশ এক এক করে জোড়া হয়।
প্যাকেজিং ও বাজারজাতকরণ: এভাবেই কারখানায় কুলার তৈরি করা হয়। এরপর কুলারের মাপে বক্স বানিয়ে সেইগুলোকে প্যাক করা হয় এবং সেগুলোকে মার্কেটে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
৪. স্যালাইন বোতল কিভাবে তৈরি হয়?
আমরা যখনই খুব অসুস্থ হয়ে পড়ি, তখনই ডাক্তার আমাদের বলেন স্যালাইন দিতে। কিন্তু আপনারা কি জানেন যে এই স্যালাইন বোতল কিভাবে তৈরি করা হয়? এবং এটি বানানোর জন্য কি কি ব্যবহার করা হয়? যদি না জেনে থাকেন, কোন চিন্তা নেই, কারণ আমি এখন আপনাদের বলব যে কিভাবে কারখানায় স্যালাইন তৈরি করা হয়।
প্রথমেই আপনাদের জানিয়ে রাখি, স্যালাইন বোতল অনেক রকমের হয়। যেমন এনএস (NS), মানে নর্মাল স্যালাইন; আরএল (RL) বা ডি ফাইভ (D5) এবং ০.৪৫% এনএস (0.45% NS)। এগুলি নানান রোগের জন্য নানান ভাবে ব্যবহার হয়।
এবার চলুন জেনে নেওয়া যাক যে কিভাবে কারখানায় এগুলো তৈরি করা হয়:
জল বিশুদ্ধিকরণ: প্রথমে জল বিশুদ্ধিকরণ করে সেটাকে গরম করে নেওয়া হয়, যার ফলে জলে থাকা সমস্ত ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়া মরে যায়।
উপাদান মিশ্রণ: এরপর এর সাথে মেশানো হয় কার্বন ডাই অক্সাইড, তারপর চিনি ও বেকিং সোডা। সবকিছু একসাথে নিয়ে একটি মেশিনে ঢালা হয়, যেটা সমস্ত রোগের সঙ্গে লড়াই করবার উপযুক্ত তরলে পরিণত করে দেয়।
বোতলজাতকরণ ও সিলিং: তারপরেই সেটাকে বোতলে ভরে সেগুলোকে খুব ভালোভাবে সিল করে দেওয়া হয়।
স্টিকিং ও স্যানিটাইজেশন: তারপর এদের গায়ের উপর স্টিকার লাগিয়ে স্যানিটাইজড করা হয় এবং বাজারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
উপসংহার
তো বন্ধুরা, আশা করি আজকের ভিডিওটি ভালো লেগেছে এবং ভিডিওটির মাধ্যমে আপনারা নতুন কিছু তথ্য পেয়েছেন। এ বিষয়ে আপনার মতামত অবশ্যই কমেন্ট বক্সে জানাবেন। ভিডিওটিকে লাইক করবেন, বন্ধুদের সাথে শেয়ারও করবেন। এবং 'অদ্ভুত দশ' চ্যানেলে নতুন হয়ে থাকলে অবশ্যই সাবস্ক্রাইব করে বেল আইকনটিতে প্রেস করে নেবেন। পাশাপাশি আমার অন্যান্য চ্যানেলের লিংক ভিডিওর ডেসক্রিপশনে রয়েছে। সেই চ্যানেলগুলোতেও একবার হলে ভিজিট করবেন।
কীওয়ার্ডস: মেডিকেল অক্সিজেন, অক্সিজেন সিলিন্ডার, এয়ার কুলার, স্যালাইন বোতল, উৎপাদন প্রক্রিয়া, কিভাবে তৈরি হয়, বিশুদ্ধ অক্সিজেন, ফ্র্যাকশনাল ডিস্টিলেশন, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, কোভিড-১৯, মহামারী, জরুরি সামগ্রী, কারখানার প্রক্রিয়া, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা।.
