বিটেলজিউস তারার রহস্য: সুপারনোভা বিস্ফোরণ কি আমরা খালি চোখে দেখতে পাবো?

 

বিটেলজিউস তারার রহস্য: সুপারনোভা বিস্ফোরণ কি আমরা খালি চোখে দেখতে পাবো?

বিটেলজিউস তারার রহস্য: সুপারনোভা বিস্ফোরণ কি আমরা খালি চোখে দেখতে পাবো?

বন্ধুরা, আমরা যখন রাত্রিবেলা খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি, তখন আমরা কয়েক লক্ষেরও বেশি তারা দেখতে পাই, যেগুলো কারো পক্ষে সম্পূর্ণ গোনা সম্ভব নয়। খালি চোখে দেখলে আমাদের আকাশে দেখতে পাওয়া যত তারা রয়েছে, সেগুলো আমাদের থেকে কম করে ৪০০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। সাধারণভাবে দেখলে আমরা যত তারা দেখতে পাই, সেগুলো সবই একই রকম দেখতে লাগে। কিন্তু আমাদের মানব সমাজ কিছু তারাকে সরতে এবং সুপারনোভা বিস্ফোরণের (Supernova Explosion) মাধ্যমে ধ্বংস হতে দেখেছে। উদাহরণস্বরূপ, শেষবার আমাদের মানব সমাজ ১৯০৪ সালে খালি চোখে কোনো একটি তারার মৃত্যু, মানে সুপারনোভা বিস্ফোরণ দেখেছিল, যেটা অন্য তারাদের মতনই বহু বছর ধরে আমাদের আকাশে স্থির ছিল।

সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা আমাদের আকাশে দেখতে পাওয়া সবথেকে উজ্জ্বল তারার মধ্যে একটি তারা, বিটেলজিউস (Betelgeuse)-এর ওপর কিছু অস্বাভাবিক ঘটনা লক্ষ্য করেছেন। যেটা পর্যবেক্ষণ করবার পর বিজ্ঞানীরা অনুমান করেছেন যে, এই তারাটি নিজের 'প্রি-সুপারনোভা স্টেজে' রয়েছে এবং যেকোনো সময় এই তারার মৃত্যু হতে পারে বা বিস্ফোরণ হতে পারে। কিন্তু সবথেকে আশ্চর্যজনক কথা এটাই যে, যখন এই তারার সুপারনোভা বিস্ফোরণ হবে, তখন এটা আমরা নিজেদের খালি চোখে কোনো টেলিস্কোপ ছাড়াই দেখতে পাবো! যেমনটা আমি এর আগের ভিডিওটি (ভবিষ্যতে আমাদের পৃথিবীতে কী ঘটতে চলেছে) তে বলেছিলাম, এই সুপারনোভা বিস্ফোরণের সময় এটি আমাদের আকাশে দেখতে পাওয়া চাঁদ এবং অন্যান্য তারাদের থেকেও বেশি উজ্জ্বল অবস্থায় দেখতে পাওয়া যাবে।

সেই কারণেই আমাদের জানতে ইচ্ছা করে যে, এই তারাটি আসলে কী? কিভাবেই বা আপনি এই তারার মৃত্যু আপনার নিজের চোখে দেখতে পাবেন? এইসব বিষয় নিয়ে বলব আজকে 'অদ্ভুত দশ'-এর এই পোস্টে। তো চলুন, শুরু করা যাক!

বিটেলজিউস: একটি রেড সুপারজায়ান্ট তারা

বিটেলজিউস আসলে একটি রেড সুপারজায়ান্ট (Red Supergiant) তারা, যেটা আমাদের থেকে প্রায় ৬৪২ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত রয়েছে। এই তারাটি আমাদের আকাশে দেখতে পাওয়া দশটি সবথেকে উজ্জ্বলতম এবং বড় তারাদের মধ্যে একটি। এই তারাটি এতটাই বড় যে, যদি আমরা এই তারাটিকে সৌরজগতের মাঝখানে সূর্যের জায়গায় রাখি, তবে এটার বাইরের পৃষ্ঠ (Outer Surface) বৃহস্পতি গ্রহকে (Jupiter) ছুঁয়ে নেবে। কিন্তু এই তারাটি খুবই অল্প বয়সের তারা, এর বয়স কেবল ৮০ লক্ষ বছর।

বিটেলজিউসের অস্বাভাবিক আচরণ: কেন এটি ম্লান হচ্ছে?

এই তারাটির সবথেকে আশ্চর্যজনক ব্যাপার এটাই যে, এটি একটি 'পালসেটিং ভেরিয়েবল ক্যাটাগরি স্টার' (Pulsating Variable Category Star)। এর মানে হলো, এই তারার আলোক রশ্মি এবং এর আকার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খুবই দ্রুত গতিতে পরিবর্তন হয়ে চলেছে। বর্তমান সময়ে এই তারার আলোক রশ্মি অনেকটাই কমে এসেছে, যে কারণে এটা আমাদের আকাশে থাকা দশটি উজ্জ্বল তারার তালিকা থেকে বেরিয়ে পড়েছে, যেটা কিনা প্রথমবার হচ্ছে এই তারার ক্ষেত্রে।

কিন্তু এই তারার আলো এত উঁচু-নিচু হওয়াটা প্রথমবার নয়, কারণ বিগত কয়েক হাজার বছর ধরে বহুবার এই তারার আলো কমেছে আবার কখনো অনেকটাই বেড়েছে। শেষবার যখন এই তারার আলো কমে গিয়েছিল, তখন এর আলো বর্তমান সময়ের আলোর পরিমাণের থেকেও কমে গিয়েছিল। কিন্তু তারপর থেকেই এই গ্রহের আলোর গতিবেগ অনেকটা উঁচু-নিচু হয়েছে, যেটা বিজ্ঞানীরা প্রথমবার দেখতে পেয়েছে। আসলে এই তারাটি খুব দ্রুত গতিতে নিজের ভর (Mass) এবং নিজের বাইরের স্তরকে (Outer Layer) হারিয়ে ফেলেছে, যে কারণে এর আলো ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে এবং এটি লাল রঙে পরিণত হতে চলেছে।

সুপারনোভা: একটি তারার মহাকাব্যিক মৃত্যু

এত কিছু ঘটনা ঘটবার পর বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন যে, হয়তো এই তারাটি নিজের 'প্রি-সুপারনোভা স্টেজে' চলে এসেছে। মানে এই তারাটি নিজের করে থাকা সমস্ত হাইড্রোজেন গ্যাসকে হিলিয়াম গ্যাসে ফিউজ (Infuse) করে ফেলেছে এবং এখন এই হিলিয়াম গ্যাসগুলোকে কার্বনে পরিণত করা শুরু করে দিয়েছে। এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ করতে প্রায় লক্ষ বছর সময় লেগে যায়, যার ফলে এই তারাটি তার মধ্যে থাকা কার্বনকে ভারী উপাদানে (Heavy Element) ফিউজ করা শুরু করে দেবে, যেটার জন্য আরও ১০০ বছর সময় লেগে যাবে। হয়তো এই কারণেই এর কোর (Core) আগের তুলনায় অনেক ছোট হয়ে গিয়েছে এবং এই কারণেই এটি কম আলোকশক্তি তৈরি করছে।

বৈজ্ঞানিকরা অনুমান করছেন যে, এই তারার সুপারনোভা বিস্ফোরণ আজ থেকে প্রায় এক লক্ষ বছরের মধ্যে যেকোনো সময় হতে পারে। মানে, আপনি যখন ভিডিও দেখছেন, তখনও হতে পারে বা অন্য কোনো সময়ও হতে পারে। কিন্তু যদি এই তারার মৃত্যু হয়, তবে এর সুপারনোভা অনেক বড় এবং উজ্জ্বলতম হবে, যেটা আমরা খালি চোখে কোনো রকম টেলিস্কোপের সাহায্য ছাড়াই কিছুদিন ধরে দেখতে পাবো। এই সুপারনোভা বিস্ফোরণ এতটাই উজ্জ্বল হবে যে, এটি কিছুদিন ধরে আমাদের আকাশে থাকা গ্রহ এবং আমাদের চাঁদের থেকেও বেশি উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। এবং আপনি এটা দিনের বেলাতেও এই সুপারনোভা বিস্ফোরণের আলো কয়েকদিন ধরে দেখতে পাবেন।

অতীতে দেখা সুপারনোভা: মানব ইতিহাসের সাক্ষী

কিন্তু এটা প্রথমবার হবে না যে, আমাদের মানব সমাজ তারার মৃত্যু মানে সুপারনোভা বিস্ফোরণ দেখতে পাবে। কারণ শেষবার আমাদের মানবজাতি ১৯০৪ সালে নিজেদের খালি চোখে একটি সুপারনোভা বিস্ফোরণ দেখেছিল। ১৯০৪ সালের অক্টোবর মাসের দিকে আকাশে হঠাৎ করে একটি উজ্জ্বল জিনিস দেখতে পাওয়া যায়। এই জিনিসটা আমাদের আকাশে দেখতে পাওয়া অন্য সব তারা এবং অন্যান্য গ্রহদের তুলনায় বেশি উজ্জ্বল অবস্থায় দেখতে পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু কিছুদিন পর এই জিনিসটা মানে অবজেক্টটা হঠাৎ করে হারিয়ে যায়। এবং সেই সময় প্রযুক্তি অতটা আধুনিক না থাকায় কোনো মানুষ বুঝতেই পারেনি যে, সেটা আসলে কী এবং কেনই বা সেটা হঠাৎ করে হারিয়ে গেল।

১৯৪০ সালের দিকে বৈজ্ঞানিকরা এই জিনিসটার ওপর খুব ভালোভাবে অধ্যায়ন করে এবং সুপারনোভা বিস্ফোরণ হওয়ার কারণগুলোকে অবশেষে খোঁজার চেষ্টা করে। তারপর তারা জানতে পারে যে, আসলে আমরা মানুষেরা ১৯০৪ সালে এক বিশাল সুপারনোভা বিস্ফোরণ দেখেছিলাম। সেটাকে মানবজাতি ১৫৭২ সালে, তারপর ১০৫৪ সালে এবং ১০০৬ সালে এই একই রকম সুপারনোভা বিস্ফোরণ দেখতে পেরেছিল এবং সেটি অফিসিয়ালি রেকর্ডও করা হয়েছে। এই সুপারনোভা বিস্ফোরণগুলোকে খালি চোখে বহুদিন আকাশে দেখতে পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু পরে বিজ্ঞানীরা এই সুপারনোভা বিস্ফোরণ হওয়ার পর সেগুলো থেকে বের হওয়া রিমন্যান্ট (Remnant) মানে অবশেষগুলোকে খুঁজে বের করে। এটা কনফার্ম করে যে, এটা আসলেই সুপারনোভা বিস্ফোরণ ছিল। যদিও এই সুপারনোভা বিস্ফোরণগুলো ছাড়াও মানুষ আগেও বহু সুপারনোভা বিস্ফোরণ খালি চোখে দেখেছিল, কিন্তু বৈজ্ঞানিকরা এখনো সেগুলোর অবশেষ খুঁজে পায়নি। তাই সেগুলোকে এখনো অফিসিয়ালিভাবে সুপারনোভা বিস্ফোরণ বলা হয়নি।

বিটেলজিউসের ভবিষ্যৎ: রহস্য ও সম্ভাবনা

এই বিটেলজিউস তারাটি আমাদের থেকে ৬৪২ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত রয়েছে, যে কারণে এর আলোর রশ্মি আমাদের কাছে পৌঁছাতে ৬০০ সালের থেকেও বেশি সময় লেগে যাবে। এমনটা হতে পারে যে, সুপারনোভা বিস্ফোরণের কারণে এই তারার মৃত্যু আজ থেকে ৬০০ সাল আগে, মানে ১৪শ শতাব্দীর দিকে হয়ে গিয়েছিল। আর এর আলোক রশ্মি হয়তো এখনো আমাদের পৃথিবীর কাছে এসে পৌঁছায়নি। মানে এই সম্ভাবনাটা থাকতে পারে যে, এই ভিডিওটি যারা দেখছে, তাদের মধ্যে বহু লোক এই তারার মৃত্যু নিজের চোখে দেখতে পাবে।

কিন্তু এতে খুশি হওয়ার দরকার নেই। কারণ কিছু বৈজ্ঞানিকরা মনে করেন, কোনো তারার আলো কমে যাওয়ার কারণে এই বিশাল আকারের জায়ান্ট তারার আলো কমবেশি হয়েছে এবং এটা খুবই সাধারণ একটি ব্যাপার। অনেকবার সুপারজায়ান্ট তারাগুলোর ঘনত্বের (Density) অস্থিরতার (Instability) কারণে সেগুলোর শক্তি কমবেশি হয়ে থাকে, যার ফলে এদের উজ্জ্বলতা (Brightness) এবং কিছু কিছু সময় এদের আকার আকৃতিতেও অনেক পরিবর্তন হয়। আবার অনেক সময় তারার ম্যাগনেটিক ফিল্ডের পরিবর্তনের কারণেও এদের উজ্জ্বলতা কমে যায়।

কিন্তু আপনাদের মন খারাপ করতে হবে না। কারণ এই বিশাল ব্রহ্মাণ্ড কিছু সময় পর পর বিভিন্ন আশ্চর্যজনক ঘটনার দ্বারা আমাদেরকে অবাক করে দেয়। তাই এটাও তো হতে পারে যে, বৈজ্ঞানিকদের সব ক্যালকুলেশন ভুল প্রমাণ করে, এই তারার মৃত্যু অনেক আগেই হয়ে যাবে এবং তার আলো কিছু বছরের মধ্যেই হয়তো আমাদের পৃথিবীতে এসে পড়বে। এমনটা হলে আপনি কিছু বছরের মধ্যেই এই তারার শেষ, মানে সুপারনোভা বিস্ফোরণ আপনি আপনার নিজের চোখে কোনো রকম টেলিস্কোপ ছাড়া দেখতে পাবেন। আর সেই সময়টা আমাদের মানব জাতির কাছে এক বিশাল বড় ঐতিহাসিক মুহূর্ত হয়ে থাকবে।

উপসংহার

তো বন্ধুরা, আজকের ভিডিওটি এই পর্যন্তই। আশা করি ভিডিওটি ভালো লেগেছে। যদি ভিডিওটি ভালো লেগে থাকে, তবে অবশ্যই লাইক করে কমেন্ট করবেন এবং বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ারও করবেন। পাশাপাশি 'অদ্ভুত দশ' চ্যানেলে যদি নতুন হয়ে থাকেন, তবে অবশ্যই সাবস্ক্রাইব করে বেল আইকনটিতে প্রেস করে নেবেন, এরকমই ইন্টারেস্টিং ভিডিও সবার আগে দেখতে। এবং থ্যাংক ইউ সো মাচ, আমাদের পরিবারটি এক লক্ষে পরিণত হয়েছে। সবাইকে ধন্যবাদ।

কীওয়ার্ডস: বিটেলজিউস, সুপারনোভা, তারার মৃত্যু, রেড সুপারজায়ান্ট, জ্যোতির্বিজ্ঞান, মহাকাশ, উজ্জ্বল তারা, প্রি-সুপারনোভা স্টেজ, আলোকবর্ষ, তারার বিস্ফোরণ, ব্রহ্মাণ্ড, রহস্য, বিজ্ঞান, অজানা তথ্য, খালি চোখে দেখা, ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

নবীনতর পূর্বতন

نموذج الاتصال