লাল চন্দন: ভারতের এই মূল্যবান কাঠের অজানা রহস্য ও আন্তর্জাতিক চাহিদা!
বন্ধুরা, আমাদের এই বিশ্বে এমন একটা সময় ছিল যখন আমাদের ভারতবর্ষ, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ একত্রিত ভাবে একটি দেশ ছিল। আর এটা মনে করা হয় যে, সেই সময় অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় আমাদের ভারতেই সবথেকে বেশি ধনরত্ন ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় এটাই যে, সেই সময় আমাদের ভারত স্বাধীন ছিল না। সেই সময় ভারত ছিল ইংরেজদের শাসিত একটি দেশ। আর এই ইংরেজরাই ভারতের স্বাধীনতার আগে অনেক ধনরত্ন আত্মসাৎ করে নিয়েছিল।
তবে আজও খুবই মূল্যবান একটি জিনিস এখনো ভারতে উপস্থিত রয়েছে, যেটা ভারতের মাটিতেই ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠেছে। আপনাদের মধ্যে হয়তো অনেকেই লাল চন্দন সম্পর্কে শুনেছেন। আর এই লাল চন্দনের উল্লেখ ভারতের একটি টলিউড সিনেমা 'পুষ্পা'-তে বিশেষভাবে দেখানো হয়েছে। কিছুদিন আগেই রিলিজ হওয়া এই 'পুষ্পা' সিনেমাটি ভারতে ভীষণভাবে হিট করেছে। আর এই সিনেমাটির প্রশংসা স্বরূপ এটাই বলা যায় যে, এই সিনেমাটি প্রায় প্রত্যেকেই দেখেছে। হয়তো আপনাদের মধ্যেও অনেকে দেখেছেন। এই সিনেমাটি দেখবার পর আপনিও এটা বুঝতে পারবেন যে, লাল চন্দন কাঠ কতটা মূল্যবান একটি সম্পদ।
লাল চন্দন কী? কেন এত মূল্যবান?
লাল চন্দনকে 'রক্তচন্দন'ও বলা হয়ে থাকে। তবে এটাকে রক্তচন্দন বলার আসল কারণ এটাই যে, এই লাল চন্দনের চক্করে এখনো পর্যন্ত বহু সংখ্যক মানুষ নিজের রক্ত ঝরিয়েছে। লাল চন্দন সমগ্র পৃথিবী জুড়ে কেবলমাত্র আমাদের ভারতবর্ষেই দেখতে পাওয়া যায়। আর এটিই হলো আমাদের পৃথিবীর সবথেকে মূল্যবান একটি কাঠ।
আজকের এই পোস্টটি আপনারা যদি সম্পূর্ণ না দেখেন, তাহলে হয়তো আপনারা কোনোদিনও অনুমান করতে পারবেন না যে, এই চন্দন কাঠের মূল্য কত হতে পারে! আপনাদের এটা বলে রাখা ভালো যে, বর্তমান সময়ে এক কিলোগ্রাম লাল চন্দন কাঠের মূল্য প্রায় ২৬ থেকে ৩০ হাজার টাকার কাছাকাছি। একটি গাছ থেকে প্রায় ২০ থেকে ২৫ কিলোগ্রামের মতো চন্দন কাঠ পাওয়া যায়। অর্থাৎ, একটি গোটা লাল চন্দন গাছের মূল্য প্রায় ৫ থেকে ৬ লক্ষ টাকার কাছাকাছি। অতএব, এই হিসাব অনুযায়ী যদি ধরা যায়, তাহলে এক টন লাল চন্দন কাঠের মূল্য প্রায় ২ কোটি টাকার মতো। এতটা পরিমাণ টাকার কথা শুনে হয়তো আপনাদের মধ্যে অনেকেই অবাক হয়ে গিয়েছেন। তবে আপনাদের অবাক হওয়া কিন্তু স্বাভাবিক। আমি নিজেও এই দাম শুনে যথেষ্ট অবাক হয়েছিলাম।
এই কাঠ এতটা মূল্যবান হওয়ার আসল কারণ হলো যে, এটি খুবই কম মাত্রায় পাওয়া যায়। লাল চন্দন গাছ শুধুমাত্র ভারতের তামিলনাড়ু এবং অন্ধ্রপ্রদেশে পাওয়া যায়। এই স্থানগুলির সব জায়গায় এই লাল চন্দন গাছ দেখতে পাওয়া যায় না, শুধুমাত্র চারটি জেলায় পাওয়া যায়। একটি লাল চন্দন গাছের সর্বনিম্ন উচ্চতা ৪ থেকে ১১ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। সমগ্র পৃথিবী জুড়ে চন্দন কাঠের প্রায় ১৬টি প্রজাতি রয়েছে, যার মধ্যে 'সেন্ট্রাল রুম' প্রজাতির সবথেকে সুগন্ধিত। তবে লাল চন্দন কাঠের মধ্যে সাদা চন্দনের মতো কোনো সুগন্ধ থাকে না।
লাল চন্দনের বহুমুখী ব্যবহার ও গুণাবলী
এই চন্দন কাঠের অনেক গুণাবলী রয়েছে। এই গাছ ছোট থেকে বড় হতে অনেক সময় লাগে। আর এই গাছকে প্রাপ্তবয়স্ক হতে প্রায় ৩০ বছর সময় লাগে। তবে উন্নত জৈব চাষের মাধ্যমে যদি এদেরকে বড় করা হয়, তাহলে ১৫ বছরের মধ্যেই এই গাছ বড় হয়ে যায়। লাল চন্দনের চাষ সাধারণত সব রকমের মাটিতেই করা যেতে পারে, তবে বালিযুক্ত মাটিতে, কর্দমাক্ত মাটিতে এবং কালো দানাদার মাটিতে এদেরকে একটু বেশি ভালো করে চাষ করা যায়।
এই কাঠ বেশিরভাগ ব্যবহার করা হয়:
খুবই মূল্যবান কাঠের আসবাবপত্র তৈরি করবার কাজে।
বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র (Musical Instruments) তৈরির কাজে।
প্রাকৃতিক রং এবং মদ তৈরির কাজে।
তবে এর সব থেকে বিশেষ ব্যবহার হয় ঔষধ তৈরির কাজে। লাল চন্দন কাঠের পাউডার দিয়ে বিভিন্ন রকমের ত্বকের রোগ যেমন অ্যালার্জি, ব্রণো ছাড়াও খুবই জটিল চর্মরোগের ট্রিটমেন্ট করা হয়ে থাকে। যেমনটা আমরা সবাই জানি যে, সাদা চন্দনের পাউডার ফেসিয়ালের কাজে ভীষণভাবে ব্যবহৃত হয়, ঠিক তেমনই লাল চন্দন কাঠের গুঁড়ো দিয়েও ফেসিয়াল তৈরি করা হয়। লাল চন্দন কাঠের পাউডার দিয়ে মুখের সৌন্দর্য বাড়ানো যেতে পারে। এই পাউডার ব্যবহার করে মুখ সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা যায়, যে কারণে লাল চন্দন কাঠ আরও একটু বেশি মাত্রায় ডিমান্ডের মধ্যে থাকে।
বৈজ্ঞানিকদের গবেষণার মাধ্যমে এটা জানতে পারা গিয়েছে যে, লাল চন্দন কাঠের মধ্যে রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা রয়েছে। এরই পাশাপাশি স্তন ক্যান্সারের প্রতিরোধ ক্ষমতার বিষয়ে বিস্তারিতভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
চোরাকারবারি ও সরকারের কঠোর পদক্ষেপ
চন্দনের এতটা ডিমান্ড থাকার জন্য সরকার এই বিষয়ে বিশেষ নজরদারি রেখেছে। যারাই এই কাঠ স্মাগলিং করবে, তাদের জন্য কঠোর শাস্তিও রাখা হয়েছে। একটি রিপোর্ট থেকে জানা গিয়েছে যে, প্রত্যেক বছর প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার মতো লাল চন্দন কাঠ স্মাগলিং করা হয়। এবার আপনারা একবার কল্পনা করে দেখুন যে, যদি ভারত সরকার দ্বারা এই আমদানি ও রপ্তানিকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তাহলে কতটা পরিমাণে লাভ পাবে আমাদের সরকার! যে কারণে বর্তমানে ভারত সরকার দ্বারা এ বিষয়ে প্রচন্ড কঠোর শাস্তি রাখা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি লাল চন্দন কাঠ স্মাগলিং করা অবস্থায় ধরা পড়ে যায়, তাহলে ১১ বছরের জন্য তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হবে।
আন্তর্জাতিক চাহিদা: চীন ও মালয়েশিয়ার আকর্ষণ
এটা তো আপনারা প্রত্যেকেই জানেন যে, চীনের অধিকাংশ মানুষ আয়ুর্বেদিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন রোগের ট্রিটমেন্ট করে থাকে। যদিও এই আয়ুর্বেদিক ট্রিটমেন্ট খুবই লাভজনক হয়, যে কারণে আয়ুর্বেদিক ট্রিটমেন্টে লাল চন্দন কাঠ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আর এই জন্য চীন দেশে লাল চন্দন কাঠের অনেক ডিমান্ড রয়েছে, যে কারণে চীনের মানুষজন চড়া দামে লাল চন্দন কাঠ কিনে থাকে। শুধুমাত্র চীনই নয়, তার সঙ্গে সঙ্গে মালয়েশিয়ার মানুষও লাল চন্দন কাঠ দিয়ে বিভিন্ন রকমের ঔষধ তৈরি করে।
সাধারণত আমাদের দেশগুলোতে লাল চন্দন কাঠ দিয়ে সেরকম কোনো মেডিসিন তৈরি করা হয় না। কিন্তু চীনের মানুষজন লাল চন্দন কাঠ ব্যবহার করে বিভিন্ন রকমের ঔষধপত্র তৈরি করে। এরই পাশাপাশি চীনে দেখতে পাওয়া যায় লাল চন্দন কাঠের তৈরি বিভিন্ন রকমের ফার্নিচার। চীনে উপস্থিত রয়েছে লাল চন্দন কাঠের তৈরি 'রেড স্যান্ডেলউড মিউজিয়াম', যেটা সমগ্র বিশ্বে ভীষণভাবে পরিচিত। এই মিউজিয়ামটি সম্পূর্ণ তৈরি হয়েছে লাল চন্দন কাঠ দিয়ে। এরই পাশাপাশি চীনে লাল চন্দন কাঠের তৈরি জিনিসপত্র বাড়িতে রাখাটা সম্মানের ব্যাপার। এই জন্য চীনের প্রত্যেকটি ধনী ব্যক্তির বাড়িতে লাল চন্দন কাঠের আসবাবপত্র দেখতে পাওয়া যায়।
একটা সময় ছিল যখন জাপানে লাল চন্দন কাঠের প্রচুর পরিমাণে চাহিদা ছিল। কারণ আয়ুর্বেদিক ঔষধ তৈরির কাজে জাপানের মানুষজন কোনো অংশে কম নয়। তবে ধীরে ধীরে যেমন সমগ্র পৃথিবীর মানুষ নিজের পুরোনো পরম্পরাগুলোকে ভুলে যেতে শুরু করেছে, ঠিক তেমনই জাপানের মানুষও তাদের পরম্পরাকে ভুলে যাচ্ছে। জাপানের বেশ জনপ্রিয় একটি মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট 'শামিসেন' লাল চন্দন কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়।
তবে সারা পৃথিবীর মধ্যে চীনে এখনো পর্যন্ত লাল চন্দন কাঠের ভীষণভাবে ডিমান্ড রয়েছে, যে কারণে চোরা কারবারিরা অনেক চড়া দামে লাল চন্দন কাঠ বিক্রি করতে পারে। তবে বর্তমানেও অসংখ্য মানুষ নিজের জীবনকে ঝুঁকিপূর্ণ করে লাল চন্দন কাঠের চোরাকারবারিতে নেমে পড়েছে। কিন্তু চোরাকারবারিরা এমনও আছে যারা পুলিশের হাত থেকে বাঁচার জন্য লাল চন্দন কাঠ পাউডার ফর্মে সাপ্লাই করে। এতটা পরিমাণে চোরাকারবারি হওয়ার জন্য বর্তমানে ৫০ শতাংশের মতো লাল চন্দন গাছ কমে গিয়েছে। পাঁচ বছর আগে লাল চন্দন কাঠ স্মাগলিং করবার সময় অনেক ব্যক্তি এনকাউন্টারে মারা গিয়েছিল। তবে এত কিছুর পরেও এখনো পর্যন্ত চোরাকারবারির সংখ্যা কিছুই কমেনি। এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য 'পুষ্পা' সিনেমাটিতে দেখতে পাবেন।
উপসংহার
তো বন্ধুরা, আজকের পোস্টটি এই পর্যন্তই। যদি ভালো লেগে থাকে, তবে লাইক, কমেন্ট এবং বন্ধুদের সাথে শেয়ার করবেন। পাশাপাশি 'অদ্ভুত দশ' চ্যানেলে নতুন হলে অবশ্যই সাবস্ক্রাইব করে বেল আইকনটিতে প্রেস করে নেবেন, এরকমই ইন্টারেস্টিং ভিডিও সবার আগে দেখতে।
কীওয়ার্ডস: লাল চন্দন, রক্তচন্দন, চন্দন কাঠ, মূল্যবান কাঠ, ভারতের সম্পদ, পুষ্পা সিনেমা, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, চন্দন কাঠের মূল্য, চোরাকারবারি, কাঠ পাচার, ভারত সরকার, আয়ুর্বেদিক ঔষধ, চীন, মালয়েশিয়া, জাপান, রেড স্যান্ডেলউড মিউজিয়াম, প্রাকৃতিক সম্পদ, বনজ সম্পদ, পরিবেশ রক্ষা, বন্যপ্রাণী আইন।
