স্বাধীনতার পর ভারতের উত্থান: এক বিধ্বস্ত দেশ থেকে অর্থনৈতিক পরাশক্তি হওয়ার পথে!
বন্ধুরা, যেমনটা আমরা সবাই জানি, ইংরেজরা প্রায় ২০০ বছর আমাদের দেশ ভারতবর্ষের উপর শাসন ও অত্যাচার করেছে। এবং ১৯৪৭ সালে যখন ইংরেজরা ভারত থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়, তখন পেছনে ফেলে যায় ভারতের করুণ অবস্থাকে। ইংরেজরা চলে যাওয়ার পর ভারতবর্ষের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ ধীরে ধীরে অনাহারে মারা যাচ্ছিল। স্কুলে পড়াশোনা শেখার পরিবর্তে বাচ্চারা রাস্তা থেকে খাবার কুড়িয়ে খেতে শিখছিল। এছাড়াও ভারতের বেশিরভাগ মানুষই ছিল নিরক্ষর। ইংরেজরা এই দেশে আসার পূর্বে ভারতবর্ষের জিডিপি (GDP) ছিল ২৭ শতাংশ, যাকে ইংরেজরা নিংড়ে ১.৯ শতাংশে এনে দিয়েছিল। স্বাধীনতা হয়তো পেয়ে গিয়েছিলাম আমরা, কিন্তু ওই দুরবস্থা থেকে বেরোতে বেরোতে ভারতের প্রায় ৭০ বছর সময় লেগে যায়।
এবং এই ভয়ানক সময়কে হার মানানোর জন্য ভারতবর্ষ কোমর বেঁধে নেমে পড়ে। যে দেশকে ইংরেজরা অকল্পনীয় দারিদ্রতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছিল, সেই দেশই ২০১৯ সালে ইংল্যান্ডকে ইকোনমিক গ্রোথে অর্থাৎ আর্থিক বিকাশের লিস্টে পেছনে ফেলে দেয়। এটা সত্যি ভারতবর্ষের জন্য একটি সাফল্যের নজির এবং এরপর থেকে ভারতের রূপ আস্তে আস্তে বদলাতে থাকে। স্বাধীনতার পর যেখানে ভারতের দারিদ্রতার হার ৭০ শতাংশ ছিল, সেখানে এখন ভারতের দারিদ্রতার হার ২০ শতাংশ। শুধু তাই নয়, ৭৭ শতাংশ মানুষ স্বাক্ষর অর্থাৎ শিক্ষিত, যার কারণে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ইংরেজি বলার দেশের মধ্যে ভারত দ্বিতীয় স্থানে (প্রথম স্থানে আমেরিকা)। একবার ভাবুন, ইংরেজদের ইংরেজি বলাতেও আমরা পেছনে ফেলে দিয়েছি!
কিন্তু ভাবনার বিষয় এটাই যে, যে দেশ ভারতকে এত পেছনে ফেলে দিয়েছিল, সেই দেশকেই অর্থাৎ ইংল্যান্ডকে ভারতবর্ষ সমস্ত দিক থেকে কিভাবে নিজের পেছনে ঠেলে দিয়েছে? এবং এই গতিতে যদি আমরা চলতে থাকি, তাহলে খুব শীঘ্রই ভারতবর্ষ পৃথিবীর একটি সুপার পাওয়ার হয়ে যাবে। কিন্তু আপনারা কি কখনো ভেবে দেখেছেন, ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট দিনটিতে আমাদের ভারতবর্ষের অবস্থা কেমন ছিল? কেমন ছিল আমাদের ভারতবর্ষে বসবাসকারী প্রত্যেকটি ভারতবাসীর অবস্থা? সত্যি কথা বলতে, ভালো ছিল না। আজকে 'অদ্ভুত দশ'-এর এই পোস্টে আমরা সেটাই জানব। তো চলুন, শুরু করা যাক!
১. ১৯৪৭: এক বিধ্বস্ত ভারত
১৯৪৭ সাল - এই সালটি একটু অদ্ভুত ছিল। কারণ যেখানে কয়েক বছর আগে অব্দিও প্রত্যেকটি ভারতীয় জনগণ স্বাধীন দেশের জন্য লড়াই করে যাচ্ছিল, সেখানে ১৯৪৭ সালে কিছু জনগণ অন্য একটি দেশ, মানে একটি ইসলামিক কান্ট্রির জন্য দাবি করতে শুরু করে। অন্যদিকে, ইংরেজরাও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতের সমস্ত শস্য, খাদ্য, পয়সা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে প্রদান করেছিল। অর্থাৎ, যে দেশ শস্য উৎপাদন করছিল, তারাই শস্য বা খাদ্য পাচ্ছিল না, তারা মারা যাচ্ছিল অনাহারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইংরেজরা জিতে গেলেও, ভারতে চলা দুর্বিষহ পরিস্থিতি কিছুতেই সামাল দেওয়া যাচ্ছিল না, যার ফলে ইংরেজরা আমাদের এই মাতৃভূমিকে টুকরো টুকরো করে দেয় এবং গড়ে ওঠে দুটি আলাদা দেশ – ভারত এবং পাকিস্তান।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইংরেজদের খারাপ অবস্থার সময় তারা বুঝতে পারে যে, এই দুটি দেশকে তারা আর শাসন করতে পারবে না। তাই এই দুটি দেশকে ছেড়ে পালিয়ে যায়। কোনো সরকার ও সেনাবাহিনী না থাকায় দুটি দেশ আলাদা হওয়ার দুরবস্থা একটি মর্মান্তিক ও ধ্বংসাত্মক রূপ নিয়ে নেয়। এই দুটি দেশ থেকে পরিযায়ী লক্ষ লক্ষ মানুষ বেঘোরে প্রাণ হারিয়েছিল এবং কোটি কোটি মানুষ খোলা আকাশে নিজের ঘর বানিয়ে নিয়েছিল। আর যারা স্বপ্ন দেখেছিল মুক্ত ও স্নিগ্ধ বাতাসে স্বাধীন দেশের বায়ুতে নিঃশ্বাস গ্রহণ করবে, তারা তো বুঝতেই পারছিল না যে, ১৪ এবং ১৫ই আগস্ট তাদের জন্য একটি আনন্দের দিন। কারণ এই দিনগুলো তাদের কাছে এক মর্মান্তিক কালরাত্রিতে পরিণত হয়েছিল।
এই কালরাত্রি ভারতে ডেকে নিয়ে আসে অকল্পনীয় দারিদ্রতা ও অনাহার। ভারতের ৭০ শতাংশ মানুষের মাথার উপর ছাদ ছিল না, এমনকি ছিল না এক দানা খাবার। যার ফলে সে সময়ের মানুষ ৩২ বছরের বেশি বাঁচতো না। একবার ভেবে দেখুন, গড় আয়ু সেই সময় ছিল মাত্র ৩২ বছর! এই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখে অনেক ইতিহাসবিদের মতামত সেই সময় ছিল যে, ইংরেজ শাসন হয়তো ভারতের পক্ষে হিতকর ছিল। তাদের মতে, ইংরেজ শাসনকালেও ভারতের এত দারিদ্রতা ও অনাহার ছিল না, যত স্বাধীনতা এবং দেশভাগের দরুন হয়েছিল।
২. স্বাধীনতার পর প্রথম পদক্ষেপ: পুনর্গঠনের সংগ্রাম
এই সময় যখন ভারত অত্যন্ত দুঃসময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল, সেখানে পৃথিবীর অন্যান্য অনেক দেশ ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন বা শিল্প বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু ভারতের পক্ষে কোনোভাবেই শিল্প বিপ্লব ঘটানো সম্ভবই ছিল না। কারণ সেই সময় ভারতের ৮৮ শতাংশ মানুষ নিরক্ষর ছিল এবং বাকি ১২ শতাংশ মানুষেরা সরকারি দপ্তরে উচ্চপদে চাকরিরত ছিল।
ভারতে কখনো ইংরেজরা না আসতো, তাহলে ভারতের শিল্প বিপ্লব বহুকাল আগেই ঘটে যেত। কারণ ইংরেজরা আসার পূর্বে পৃথিবীর অর্থ ব্যবস্থায় ভারতের অবদান ২৭ শতাংশ ছিল। অর্থাৎ, ১৭০০ সালে ভারতের জিডিপি ২৭ শতাংশ ছিল, যা ২০০ বছর ইংরেজ দ্বারা শাসিত হওয়ার পর ৩ শতাংশে নেমে যায়। ইংরেজ শাসনের আগে ২৭ শতাংশ অর্থ ব্যবস্থার মধ্যে ২০ শতাংশ আসত বাণিজ্যিক দিক থেকে। ভারত মসলা, চায়ের পাতা, কাঠ, সোনা-রূপা, সুন্দর কারুকার্য করা মার্বেল পাথর, কাঠের মূর্তির ব্যবসা থেকে ভারতবর্ষের অনেক লাভ হতো। কারণ সেই সময় এই জিনিসগুলোর ব্যবসা অনেক লাভজনক ও প্রচলিত ছিল এবং আন্তর্জাতিক বাজারেও এই সমস্ত জিনিসের চাহিদা ছিল বেশ ভালো। কিন্তু ইংরেজরা আসার পর এই সমস্ত জিনিস তৈরির কারখানাগুলোকে বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং যারা কারখানা বন্ধ করতে অস্বীকার করে, তাদের কারখানা জ্বালিয়ে ছাই করে দেওয়া হয়।
এবং আমরা সবাই জানি, ইংরেজরা কিভাবে আমাদের ভারতের হস্ত ও কুটির শিল্প তিলে তিলে ধ্বংস করেছিল। কারণ ইংরেজরা ভারত থেকে কাঁচামাল নিজেদের দেশে নিয়ে যেত, সেখানে পণ্য তৈরি করে ভারতে তিন থেকে চার গুণ মুনাফায় বিক্রি করত। এই ইংরেজরা চলে যাওয়ার পরে ভারতের শিল্পের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হয়ে পড়ে। কারণ সেই সময় ভারতের কাছে কোনো ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফ্যাক্টরি বা কারখানা ছিল না এবং ৬০ শতাংশ মানুষের জীবিকা নির্বাহ করবার জন্য তখন শুধু কৃষিকাজই বাকি ছিল। এবং দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় কৃষিকাজের অবদান ছিল ৫৪ শতাংশ। ঠিক এই কারণের জন্যই সেই সময় আমাদের দেশের ওয়ার্ল্ড জিডিপির ৩.৯ শতাংশ ছিল।
সমস্ত রকম অর্থনৈতিক সমস্যার সঙ্গে সঙ্গে ভারত ও পাকিস্তানের ঝগড়া, তার পাশাপাশি যখন ইংরেজরা আমাদের রাজ্যগুলোকে ভাগ করেছিল, তখন ভাষা ভিত্তিক করে ভাগ করেনি। ফলে মুম্বাইয়ের জন্য গুজরাটি, মারাঠি ভাষাভাষী মানুষদের ঝামেলা শুরু হয়। এবং সমস্ত বিষয়গুলোকে দৃষ্টিপাত করে সমস্ত দেশের ধারণা ছিল, ভারত গৃহযুদ্ধ ও সঠিক রাজনৈতিক নেতা না থাকায় ভারতবর্ষ কোনোদিনই বিকশিত দেশ হয়ে উঠতে পারবে না। আর এমনটাই তখনকার সব রকম বুদ্ধিজীবীদের মতামত ছিল।
৩. নতুন ভারতের ভিত্তি স্থাপন: নেহেরুর দূরদর্শিতা
কিন্তু ১৯৫১ সালে প্রথম লোকসভা হওয়ার পর ভারতের স্থিতি এবং অবস্থা উন্নতির দিকে যায়। প্রথমত যে ভালো কাজটি হয়েছিল, সেটা হচ্ছে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেকটা মানুষকে সমান চোখে দেখে প্রত্যেকটি ভারতবাসীকে ভোটাধিকার দেওয়া হয়। বিগত ভারতবর্ষের ইতিহাসে জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে সবাইকে কখনো সমান অধিকার দেওয়া হয়নি। ফলে এই পদক্ষেপ বা সিদ্ধান্ত ছিল একটি বড় পদক্ষেপ। এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসাবে জওহরলাল নেহেরু 'হিন্দু সিভিল কোড' (Hindu Civil Code) পাস করান, যার ফলে প্রতিটি বিধবা মহিলার গত স্বামীর সম্পত্তির ওপর সমান অধিকার গ্রাহ্য করা হয়।
জওহরলাল নেহেরুর সবসময় একটি দিকে দৃষ্টি ছিল যে, ভারতকে বৈজ্ঞানিক ও টেকনোলজির দিক থেকে আরও উন্নত করতে হবে। এবং তার এই মনোভাবের জন্য ভারতে আরও একবার উদ্যোগের সাথে কাজ শুরু হয়, যার ফলে ভারতের আর্থিক ব্যবস্থা আরও কিছুটা উন্নতি করে। এবং এর ফলে ভারতে 'ফাইভ ইয়ার প্ল্যান' (Five Year Plan) শুরু হয়, যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ভারতকে উন্নতির শিখরে পৌঁছানো এবং ভারতীয় অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ও ভারতের মানুষদেরকে দারিদ্রতার হাত থেকে বার করা। এই যোজনার জন্য ২৩৭৮ কোটি টাকা ধার্য করা হয় এবং এই অর্থকে মূলত কৃষি ক্ষেত্রে, সেচ ক্ষেত্রে, ট্রান্সপোর্ট, কমিউনিকেশন ও শিল্প ক্ষেত্রের উন্নতির জন্য প্রয়োগ করা হচ্ছিল। এবং এই যোজনার জন্য ভারতের সমস্ত ক্ষেত্রে উন্নতি হয় এবং এজন্য টার্গেট অফ গ্রোথ রেট রাখা হয়েছিল ২.১ শতাংশ, যেখানে ভারতীয়রা অর্থাৎ আমরা অনেক কঠোর পরিশ্রম করে ৩.৬ শতাংশ গ্রোথ রেট লাভ করি।
৪. শিল্প বিপ্লব ও টাটার ভূমিকা
এবং এর ফলে সেই সময় ভারতে প্রচুর ভারতীয় ইন্ডাস্ট্রির জন্ম হয়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ও অন্যতম হচ্ছে 'টাটা লোকোমোটিভ'। এই কোম্পানিটি স্বাধীনতার আগে বয়লার লোকোমোটিভ বানানোর কাজ করত। আগে অবধি ইংল্যান্ড থেকে ভারতে রপ্তানি হতো। তারা টাটার চুক্তি করত না। ইংরেজরা টাটার সাথে ভারতীয় লোকেদের ব্যবসা করতে দিত না। টাটা, জার্মানির সাথে বয়লার ও লোকোমোটিভের ব্যবসা করত। টাটার বয়লার ও লোকোমোটিভ তৈরির শক্ত ও কঠিন কাজ করবার জন্য জামশেদপুর থেকে পাঠানদের নিয়ে আসা হতো। কিন্তু দেশভাগের পর তো সে পাঠানরা পাকিস্তানে চলে গিয়েছিল। ফলে টাটার কাজ কিছুদিনের জন্য থেমে যায় এবং সাধারণ মানুষকে নিয়ে কাজ করানো শুরু করা হয়।
তবে আরেকটি সমস্যা ছিল, সাধারণ মানুষের পক্ষে এত শক্ত কঠিন কাজ করা কিছুটা অসুবিধাজনক হয়ে পড়ে। ফলে তাদেরকে ভালো করে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ শুরু হয় এবং এই প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য বেশিরভাগ সময়ই কারখানাগুলো বন্ধ থাকত। ফলে বয়লার তৈরির কাজ সময়ের আগেই বন্ধ হয়ে যায়। এরপর অনেকটা সময় কেটে যায় এবং হঠাৎ করে টাটার ভাগ্য খুলে যায়। 'ডাইমলার বেঞ্জ' (Daimler-Benz) কোম্পানি টাটা মোটরসকে কন্টাক্ট করে। ডাইমলার বেঞ্জ টাটার কাছে অনুরোধ করে, তারা যেন ট্রাক অর্থাৎ লরি বানানোর কাজ শুরু করে দেয় এবং টাটা এই কাজে আগ্রহী কিনা, সেটাও জানাতে বলে। এবং টাটা কোম্পানি তাতে রাজি হয়ে যায়। এবং এইভাবেই শুরু হয়ে যায় ট্রাক তৈরির কাজ এবং দেখতে দেখতে টাটা কোম্পানি একটি বিশাল আকার ধারণ করে। এরপর টাটা বয়লার লোকোমোটিভ সহ ট্রাক, রোড রোলার, আর্টস ইঞ্জিন, ট্র্যাক্টর সহ আরও অনেক ইঞ্জিনিয়ারিং ইকুইপমেন্ট তৈরি করতে শুরু করে। টাটার এই পদক্ষেপটি ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশনের বীজ বপন করে দেয় এবং এভাবেই ভারতে শুরু হয়েছিল শিল্পায়ন।
৫. দারিদ্র্য হ্রাস ও স্বাক্ষরতার বৃদ্ধি
এভাবে আস্তে আস্তে ভারতের দারিদ্রতার হার কমতে থাকে। ১৯৪৭ সালে দারিদ্রতার হার ছিল ৭০ শতাংশ এবং সেটা আস্তে আস্তে কমে ২০ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। আশা করা যায়, ভবিষ্যতে আরও কমবে এবং একসময় ভারতে দারিদ্রতা নামক জিনিসটি থাকবেই না। এবং এভাবে আমাদের ভারতের জিডিপি ৩.৬ শতাংশ থেকে ৯.৫ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে বর্তমানে।
শুধুমাত্র অর্থনৈতিক দিক থেকে ভারতকে এগিয়ে গেলে হবে না, স্বাক্ষরতার দিক থেকেও এগিয়ে যেতে হবে। এবং এর জন্য করতে হবে পড়াশোনা। ফলে সেসময় ভারতীয় সংবিধানে একটি নতুন আইন যোগ হয়, যেখানে ৬ থেকে ১৪ বছর শিশুদের শিক্ষা গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক করা হয়। এবং এই আইনকে ২০০২ সালে সরকার 'ফান্ডামেন্টাল রাইটস' (Fundamental Rights) বলেও ঘোষণা করে দেয়। অর্থাৎ, ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী ভারতীয় শিশুদের শিক্ষা গ্রহণ করাটা তার একটি মৌলিক অধিকার। এরপর থেকে ভারতের ভবিষ্যৎ অনেক উজ্জ্বল হবে বলে ধারণা করা হয়। কারণ ১৯৪৭ সালের গণনা অনুযায়ী, সেই সময় ভারতবর্ষে ৭০ শতাংশ মানুষ নিরক্ষর ছিল এবং বর্তমানে স্বাক্ষরতার হার ৭৭ শতাংশ। এটি আমাদের কাছে একটি অনেক বড় সাফল্যের বিষয়। এবং এই স্বাক্ষরতার কারণে শুধুমাত্র কৃষিকাজ ভারতবর্ষের অধিবাসীদের একমাত্র জীবিকা নয়, আরও নানান ক্ষেত্রে ভারতীয়রা দক্ষতার সাথে কাজ করেছে এবং অনেক ভারতীয় বিদেশে গিয়েও কাজ করছে।
৬. স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি ও গড় আয়ু বৃদ্ধি
এই সাফল্য বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো চিকিৎসা বিজ্ঞান। এটি বলার কারণ হচ্ছে, মাত্র ৭৪ বছরের মধ্যে যেখানে ডাক্তারির ছাত্রের সংখ্যা ৩৫ হাজার থেকে সোজা ৮ লক্ষ ভারতীয় ডাক্তারে এসে পৌঁছেছে। এবং এই কারণেই ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞান অনেক নতুন আবিষ্কার ও রিসার্চ করছে এবং যেগুলোতে তারা অনেক সাফল্য অর্জনও করেছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের এত উন্নতির কারণে ১৯৪৭ সালের মানুষদের গড় আয়ু ৩২ বছর থেকে এখন ৬৯ বছর হয়ে গিয়েছে, অর্থাৎ প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি। কুর্নিশ জানাই সেই সমস্ত ডাক্তারদের, যারা সারা জীবন আমাদের পাশে থেকেছে এবং অক্লান্ত পরিশ্রমের দ্বারা মুমূর্ষু রোগীকেও সুস্থ করে তুলেছে।
৭. অর্থনৈতিক পুনরুত্থান ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
এই সমস্ত উন্নতির বিষয়গুলো একে অপরের সাথে চেইন রিঅ্যাকশনের মতন কাজ করেছে। অর্থাৎ, একটি ক্ষেত্রে উন্নতির সাথে সাথে বাকি সমস্ত ক্ষেত্রে উন্নতি আসতে থাকে। এত উন্নতির কারণে ভারতের জিডিপি ইংল্যান্ডকেও ছাপিয়ে গিয়েছিল ২০১৯ সালে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, করোনার অতিমারী অন্যান্য দেশের তুলনায় ভারতকে বেশি ক্ষয়ক্ষতি করে, যার ফলে ইংল্যান্ড আবারও আমাদেরকে পঞ্চম স্থান থেকে সরিয়ে ষষ্ঠ স্থানে এনে দেয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্ডিয়ার গ্রোথ যেভাবে চলছে, সেভাবেই চলবে। আগামী চার বছরের মধ্যে ভারত আবারও ইংল্যান্ডকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবে এবং ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিতে ভারতের স্থান হবে তৃতীয়।
আমাদের ভূমি ভারতবর্ষের স্বাধীনতার মাত্র ৭৪ বছরের মধ্যেই কাঙাল অবস্থা থেকে এতটা উন্নয়নশীল একটি দেশে পরিণত হয়েছে। ১৯৪৭ সালে আমাদের জিডিপি ২৯৩৯ বিলিয়ন রুপি থেকে সোজা ১ লক্ষ ৪০ হাজার ৭৬৬ বিলিয়ন রুপি হয়ে গিয়েছে। এই এত উন্নতি কিন্তু কোনো একটি নির্দিষ্ট পদক্ষেপ বা নির্দিষ্ট মানুষের জন্য হয়নি। এই উন্নতি আমরা অর্জন করতে পেরেছি, অর্থাৎ ভারতের প্রতিটি মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে আমরা এই উন্নতি অর্জন করতে পেরেছি। ভারতবর্ষ প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে ডেভেলপমেন্ট করবার চেষ্টা করেছে এবং ততক্ষণ চেষ্টা করেছে, যতক্ষণ না তারা উন্নতির চরম শিখর স্পর্শ করতে পেরেছে।
আর এইসব ঘটনাগুলোকে দূরদর্শিতার মাধ্যমে দেখে গিয়েছিল ডক্টর এপিজে আব্দুল কালাম। তিনি তাঁর বই 'ইন্ডিয়া ২০২০: এ ভিশন ফর দ্য নিউ মিলেনিয়াম' (India 2020: A Vision for the New Millennium) লিখে গিয়েছিলেন, ভারত আগামী দুই শতকের মধ্যে পৃথিবীর একটি সুপারপাওয়ার হয়ে দাঁড়াবে। শুধুমাত্র ডক্টর এপিজে আব্দুল কালামই নয়, সারা পৃথিবীর বুদ্ধিজীবীরা, যারা ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ কোনোদিনই নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে না বলে উল্লেখ করেছিল, তাদেরই এক বিশাল অংশ ভারতকে ভবিষ্যতের সুপার পাওয়ার ধরে নিয়েছিল। এবং তখনই ভারতবর্ষে কোভিড-১৯ এর জন্য লকডাউন শুরু হয়, যার ফলে ভারতবর্ষে জিডিপি বাকি অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি নিচে নেমে যায় এবং ২০২০ সালের এপ্রিল-জুন মাসে ভারতের জিডিপি ২৩ শতাংশ নেমে যায় এবং তারপর আরও ১০ শতাংশ নেমে যায়। এই ক্ষতিপূরণ করতে ভারতের আরও অনেক বছর সময় লেগে যাবে। কিন্তু আমরা ভারতীয়রা, আমরা চাইলে সবকিছুই করতে পারি। আমরা চাইলে এবং কঠোর পরিশ্রম করলে ভারতীয় ইকোনমিক গ্রোথের রেট পুনরায় পূর্বের স্থানে ফিরিয়ে নিতে পারি, যার জন্য আমাদের প্রত্যেকটি মানুষকে কঠোর ও অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হবে। আমাদের হার মানলে চলবে না। আমাদের লড়ে যেতে হবে, ঠিক যেভাবে লড়েছিল আমাদের পূর্বপুরুষেরা ১৯৪৭ সাল থেকে।
উপসংহার
তো বন্ধুরা, কমেন্টে অবশ্যই জানাবেন, আপনারা কি এই লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করছেন?
কীওয়ার্ডস: ভারতের স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক বৃদ্ধি, ১৯৪৭ সালের ভারত, ইংরেজ শাসন, জিডিপি, দারিদ্র্য হ্রাস, স্বাক্ষরতা বৃদ্ধি, শিল্প বিপ্লব, টাটা কোম্পানি, জওহরলাল নেহেরু, ফাইভ ইয়ার প্ল্যান, স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি, গড় আয়ু, সুপার পাওয়ার ভারত, এপিজে আব্দুল কালাম, কোভিড-১৯ প্রভাব, ভারতীয় অর্থনীতি, দেশভাগ, উন্নয়নশীল দেশ।
