কোয়ান্টাম ফিজিক্স বা কোয়ান্টাম মেকানিক্স
Quantum physics or mechanics explained in Bangla
কোয়ান্টাম ফিজিক্স: পদার্থের অদ্ভুত আচরণ ও মহাবিশ্বের জটিল রহস্য!
বন্ধুরা, আমাদের চারপাশের অনেক ঘটনা নির্ভুলভাবে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম ক্লাসিক্যাল ফিজিক্স (Classical Physics)। একটি বলকে ব্যাট দিয়ে আঘাত করার পর কোথায় যাবে, তা নির্ভুলভাবে বলে দেওয়া সম্ভব ক্লাসিক্যাল ফিজিক্সের মাধ্যমে। কিন্তু পদার্থের অত্যন্ত ক্ষুদ্রতম পর্যায়ে, অর্থাৎ সাব-অ্যাটোমিক (Sub-atomic) পর্যায়ে ক্লাসিক্যাল ফিজিক্সের সকল সূত্র এবং ব্যাখ্যা অর্থহীন হয়ে পড়ে। সেখানে বিভিন্ন অদ্ভুত এবং অবিশ্বাস্য আচরণ লক্ষ্য করা যায়। যার কারণে কোয়ান্টাম ইলেক্ট্রোডাইনামিক্সে (Quantum Electrodynamics) অবদানের জন্য নোবেল পুরস্কার পাওয়া রিচার্ড ফাইনম্যান (Richard Feynman) বলেছিলেন, "যদি আপনি মনে করেন আপনি কোয়ান্টাম ফিজিক্স বুঝতে পেরেছেন, তার মানে আপনি কোয়ান্টাম বোঝেননি।" তার এই উক্তি থেকে ধারণা করা যায়, কোয়ান্টাম ফিজিক্স বা কোয়ান্টাম মেকানিক্স (Quantum Mechanics) আসলে কতটা জটিল বিষয়। যদিও বর্তমানে যুক্তিসঙ্গতভাবে সবচেয়ে সফল সাইন্টিফিক থিওরি হচ্ছে এই কোয়ান্টাম ফিজিক্স। কারণ কোয়ান্টাম ফিজিক্স ব্যবহার করে আমরা বিভিন্ন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছি, যেমন কম্পিউটার, ডিজিটাল ক্যামেরা, এলইডি স্ক্রিন, লেজার, নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট ইত্যাদি।
পদার্থের ক্ষুদ্রতম পর্যায়ে কী এমন অদ্ভুত আচরণ দেখা যায়, যার কারণে কোয়ান্টাম ফিজিক্সকে বুঝেও মনে হয়, বুঝলাম না? চলুন, আজ বাঙ্গালা কথা আপনাদের কোয়ান্টাম ফিজিক্সের এই রহস্যময় জগতে নিয়ে যাবে।
১. ডবল স্লিট এক্সপেরিমেন্ট: আলোর ওয়েভ-পার্টিক্যাল দ্বৈততা
প্রথমেই ডবল স্লিট এক্সপেরিমেন্ট (Double Slit Experiment) সম্পর্কে ভালোভাবে বলে নেওয়া দরকার। যদি এমন একটি কাঠামোর মধ্য দিয়ে পানির ঢেউ বা ওয়েভকে প্রবাহিত করেন, তবে অপর প্রান্তে থাকা পর্দায় দেখা যাবে কিছু স্থানে উঁচু ঢেউ, কিছু স্থানে নিচু ঢেউ, আবার কিছু স্থানে ঢেউ থাকছেই না। এমনটা হবার কারণ হচ্ছে, প্রথমে যে ঢেউটি প্রবাহিত করা হয়েছিল, তা প্রবেশ করে দুইটি ঢেউয়ে রূপান্তরিত হয়। যার কারণে একটি ঢেউ আরেকটি ঢেউয়ের উপর আছড়ে পড়ে। এর ফলে সমদশা বা একই বৈশিষ্ট্যের দুইটি ঢেউ একসাথে হয়ে উঁচু ঢেউ তৈরি করে। আবার সম্পূর্ণ বিপরীত দশা বা বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ঢেউ একটি আরেকটিকে ক্যান্সেল করে দেয়। যার কারণে অপর প্রান্তে থাকা পর্দায় উঁচু-নিচু ঢেউয়ের এমন প্যাটার্ন দেখা যায়, যাকে বলে ইন্টারফেয়ারেন্স প্যাটার্ন (Interference Pattern)। এই ইন্টারফেয়ারেন্স প্যাটার্নকে এরকম ওয়েবের মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়। এই ওয়েবের অ্যামপ্লিচিউড (Amplitude) বা বিস্তার যেখানে বেশি, সেখানে বেশি উঁচু ঢেউ এবং বিস্তার যেখানে কম, সেখানে ছোট ঢেউ।
১৮০১ সালে ব্রিটিশ পদার্থবিদ থমাস ইয়ং (Thomas Young) সর্বপ্রথম এই এক্সপেরিমেন্ট করেন। এক্ষেত্রে তিনি ব্যবহার করেন আলো। তিনি দেখতে পান আলো ইন্টারফেয়ারেন্স প্যাটার্ন শো করছে, যা প্রমাণ করে আলো হচ্ছে ওয়েভ বা আলোর মধ্যে ওয়েভের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ১৯ শতকের শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত ছিলেন যে আলো হচ্ছে ওয়েভ।
২. ফটোইলেকট্রিক ইফেক্ট ও আইনস্টাইনের ফোটন তত্ত্ব
কিন্তু সমস্যার সৃষ্টি হয় ১৮৮৭ সালে। জার্মান পদার্থবিদ এইচ.আর. হার্জ (H.R. Hertz) একটি ঘটনা লক্ষ্য করেন, যাকে বলে ফটোইলেকট্রিক ইফেক্ট (Photoelectric Effect)। সাধারণভাবে আলো কোনো মেটাল থেকে ইলেকট্রন অপসারণ করতে পারে না। কিন্তু হার্জ দেখেন, দৃশ্যমান আলোর চেয়ে উচ্চ শক্তি সম্পন্ন আলো মেটাল থেকে ইলেকট্রন অপসারণ করতে পারে। আলো যদি ওয়েভ হয়ে থাকে, তাহলে এমনটা হবার কথা নয়। কিন্তু তারপরেও এমনটা হচ্ছিল, যার ফলে একটি রহস্য তৈরি হয়। পরবর্তীতে এই রহস্য উদঘাটন করেন আলবার্ট আইনস্টাইন। তিনি প্রস্তাব করেন, আলো ওয়েভ নয়, বরং আলো হচ্ছে প্যাকেট অফ এনার্জি বা ওয়েভ প্যাকেট, যাকে আমরা বর্তমানে ফোটন (Photon) বলে জানি। তিনি বলেন, এই ওয়েভ প্যাকেটের শক্তির পরিমাণ ওয়েভের ফ্রিকোয়েন্সির সমানুপাতিক। অর্থাৎ,
যাই হোক, এখান থেকে একটি প্রশ্নের জন্ম হয়: আলো বা ফোটন কী? ওয়েভ নাকি পার্টিক্যাল? কারণ আলো পার্টিক্যালের মতো আচরণ না করলে মেটাল থেকে ইলেকট্রন অপসারণ করতে পারার কথা নয়।
৩. ওয়েভ-পার্টিক্যাল দ্বৈততা: আলোর রহস্যময় আচরণ
পরবর্তীতে ১৯০৯ সালে ব্রিটিশ পদার্থবিদ জি.আই. টেইলর (G.I. Taylor) ১০০ বছর আগে থমাস ইয়ংয়ের করা এক্সপেরিমেন্ট আবার করেন। কিন্তু এক্ষেত্রে তিনি প্রথমেই সিঙ্গেল ফোটন ব্যবহার করেন। সিঙ্গেল ফোটনের ক্ষেত্রে তিনি পর্দায় সিঙ্গেল স্পট পাচ্ছিলেন। আলো যদি ওয়েভ হয়, তাহলে একটি ফোটনের জন্য একটি স্পট পাবার কথা নয়। কিন্তু যখন অনেকগুলো ফোটন একসাথে ডবল স্লিটে নিক্ষেপ করেন, তখন পর্দায় ইন্টারফেয়ারেন্স প্যাটার্ন লক্ষ্য করেন। ফলে বোঝা গেল, সিঙ্গেল বা আলাদাভাবে একটি ফোটন পার্টিক্যালের মতো আচরণ করে এবং অনেকগুলো ফোটন একসাথে ওয়েভের মতো আচরণ করে। ফলে ধরে নেওয়া হয়, ফোটন একই সাথে ওয়েভ এবং পার্টিক্যাল, যা খুবই বিব্রতকর।
৪. ইলেকট্রনের অদ্ভুত আচরণ: পর্যবেক্ষণের প্রভাব
পরবর্তীতে ডবল স্লিট এক্সপেরিমেন্ট ব্যবহার করা হয় ইলেকট্রনের ক্ষেত্রে। এবং ইলেকট্রনের ক্ষেত্রে যে ফলাফল পাওয়া যায়, তা বলতে গেলে বিজ্ঞানীদের জন্য একটি বড় ধাক্কা ছিল। তারা দেখতে পান, ইলেকট্রনের ক্ষেত্রেও ইন্টারফেয়ারেন্স প্যাটার্ন পাওয়া যাচ্ছে। তারা বলতে গেলে হতবাক হয়ে যান। যেই ইলেকট্রনকে এতদিন তারা পার্টিক্যাল মনে করে আসছিলেন, তা এখন ওয়েভের মতো আচরণ প্রদর্শন করছে। এবং শুধু ওয়েভের মতো আচরণ করছে শুধু তাই নয়, সাথে সাথে আরও একটি অদ্ভুত বিষয় দেখা গেল।
ইলেকট্রন দিয়ে ডবল স্লিট এক্সপেরিমেন্ট করার সময় যদি কোনো ডিটেক্টর ব্যবহার করা হয় বা দেখার চেষ্টা করা হয়, তবে ইলেকট্রনের আর ওয়েভ বৈশিষ্ট্য পাওয়া যাচ্ছে না। তখন পাওয়া যাচ্ছে ইলেকট্রনের পার্টিক্যাল বৈশিষ্ট্য। কিন্তু আবার যদি ডবল স্লিট এক্সপেরিমেন্টকে অবজার্ভ না করে বা দেখার চেষ্টা না করে, তখন আবার ইলেকট্রন ওয়েভের মতো আচরণ করছে। যা এক অদ্ভুত রহস্যের জন্ম দেয়। যখন ইলেকট্রনকে কেউ দেখছে, তখন সে পার্টিক্যাল; যখন কেউ দেখছে না, তখন সেটি ওয়েভ! সত্যিই অদ্ভুত একটি বিষয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ইলেকট্রন কিভাবে ওয়েভের মতো আচরণ করতে পারে? সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে আমরা পরিচিত, যা আপ অ্যান্ড ডাউন এর মাধ্যমে তৈরি হয়। কিন্তু ইলেকট্রনের ওয়েভ বা ঢেউ কেমন?
৫. শ্রোডিঞ্জার ইকুয়েশন ও সম্ভাবনার তরঙ্গ
পরবর্তীতে ১৯২৫ সালে এরউইন শ্রোডিঞ্জার (Erwin Schrödinger) ইলেকট্রনের ওয়েভের শেপ কেমন হবে বা ওয়েভ কেমন হবে, তার একটি সমীকরণ প্রদান করেন। সমীকরণটি আমাদের পরিচিত ক্লাসিক্যাল ফিজিক্সের মতো সহজ সরল ছিল না। এমনকি শ্রোডিঞ্জার নিজেও এই সমীকরণের পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। এই সমীকরণের ব্যাখ্যা নিয়ে অনেক তর্ক বিতর্ক চলে।
পরবর্তীতে ১৯২৬ সালে জার্মান পদার্থবিদ ম্যাক্স বর্ন (Max Born) ওয়েভ ইকুয়েশনের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে একটি চমৎকার এবং যুগান্তকারী আইডিয়া উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, ওয়েভ প্রবাবিলিটি (Probability) বা সম্ভাবনার সাথে সম্পৃক্ত। ওয়েভ যেখানে বড় থাকবে, সেখানে ইলেকট্রন পাবার সম্ভাবনা বা প্রবাবিলিটি বেশি থাকবে। এবং যেখানে ওয়েভ ছোট থাকবে, সেখানে ইলেকট্রন পাবার সম্ভাবনা কম হবে। তার মানে আপনি নিশ্চিতভাবে বলতে পারবেন না ইলেকট্রনটি কোথায় আছে। আপনি শুধু একটি নির্দিষ্ট স্থানে ইলেকট্রন পাবার সম্ভাবনা কত, তা বলতে পারবেন। অদ্ভুত শোনালেও এইভাবে ইলেকট্রনের ওয়েভ আচরণ বর্ণনা করা হয়। আপনি যখন একটি ইলেকট্রন ডবল স্লিটের মধ্যে ছুঁড়ে মারবেন, তখন আপনি বলতে পারবেন না ইলেকট্রনটি পর্দার কোথায় গিয়ে আঘাত করবে। কিন্তু আপনি প্রবাবিলিটি ওয়েভ ইকুয়েশন ব্যাখ্যা করে পর্দার নির্দিষ্ট একটি কোন স্থানে আঘাত করার সম্ভাবনা কত, তা বলতে পারবেন। আর শ্রোডিঞ্জার এবং ম্যাক্স বর্নের ব্যাখ্যা আমাদের বলে ইলেকট্রন কিভাবে কক্ষপথে থাকবে, কক্ষপথের শেপ বা আকার কেমন হবে ইত্যাদি। পরমাণুর কক্ষপথের কোথায় ইলেকট্রন থাকবে, আমরা শুধু তার সম্ভাবনা বলতে পারব।
এত কিছুর পরেও কিন্তু রহস্য থেকেই যাচ্ছে। কারণ আমরা ইলেকট্রনকে একই সাথে অনেকগুলো স্থানে পাবার সম্ভাবনার কথা বলছি। কিন্তু যখন কোথায় আছে তা দেখার চেষ্টা করছি বা মেজারমেন্ট করছি, তখন ইলেকট্রনকে কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানেই খুঁজে পাচ্ছি। কিন্তু কেন আমরা প্রথমেই নিশ্চিত করে বলতে পারছি না ইলেকট্রনটি কোথায়? এই বিষয়টি নিয়ে অনেক ব্যাখ্যা রয়েছে। তবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাটি দেন হাইজেনবার্গ (Heisenberg) এবং নীলস বোর (Niels Bohr)। এবং তাদের এই ব্যাখ্যাকে বলে কোপেনহেগেন ইন্টারপ্রিটেশন (Copenhagen Interpretation)। তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যতক্ষণ না আমরা ইলেকট্রন কোথায় রয়েছে তা দেখার চেষ্টা করব, ততক্ষণ ইলেকট্রন একই সাথে সম্ভাব্য সকল স্থানে একই সময়ে উপস্থিত থাকবে।
নীলস বোরের মতে, যখন একটি ইলেকট্রন বা যেকোনো সাব-অ্যাটোমিক পার্টিক্যাল মেজারমেন্ট বা দেখার চেষ্টা করা হয়, তখন একটিভ মেজারমেন্ট ফোর্স ইলেকট্রন বা অন্যান্য সাব-অ্যাটোমিক পার্টিকেলকে তার সম্ভাব্য সকল স্থানের উপস্থিতিকে একটি নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে আসতে বাধ্য করে। বিষয়টি খুবই অদ্ভুত এবং সেই সাথে ভুতুড়ে। ভেবে দেখুন, আপনি কোনো কিছু দেখছেন না মানে এটি একই সাথে একই সময়ে সকল স্থানে উপস্থিত। এবং যখনই দেখবেন, তখনই এটি একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে আসবে। কোনো একটি বস্তুর এমন আচরণ ভাবাও তো কঠিন। নীলস বোর মেনে নিয়েছিলেন যে, প্রকৃতির বাস্তবতা খুবই অস্পষ্ট। কিন্তু আইনস্টাইন এটি মানতে পারেননি। ফলে তিনি বলেন, "আমি ভাবতে চাই না যে, দিকে না তাকালেও চাঁদ তার অবস্থানেই থাকবে।" আইনস্টাইন বিশ্বাস করতেন, কোয়ান্টাম ফিজিক্স বা কোয়ান্টাম মেকানিক্স ভুল নয়, তবে এটি অসম্পূর্ণ।
৬. কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট (Quantum Entanglement): ভৌতিক সংযোগ
যাই হোক, এরপর সামনে আসে সাব-অ্যাটোমিক পার্টিকেলের আরও একটি অদ্ভুত আচরণ, যার নাম এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট (Entanglement)। এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট হচ্ছে একটি থিওরিটিক্যাল প্রেডিকশন, যা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ইকুয়েশন থেকে পাওয়া যায়। দুইটি পার্টিক্যাল যদি খুব কাছাকাছি এসে মিথস্ক্রিয়া করে বা একই ইভেন্ট থেকে দুটি পার্টিক্যাল তৈরি হয়, তবে ওই দুটি পার্টিকেলের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে এক ধরনের সম্পর্ক স্থাপন হয়। যার ফলে পার্টিকেল দুইটিকে যত দূরেই রাখা হোক না কেন, তাদের মধ্যে এক ধরনের যোগাযোগ থাকবে। আইনস্টাইন যাকে বলেছিলেন "স্পুকি অ্যাকশন অ্যাট এ ডিসটেন্স (Spooky action at a distance)"।
এই এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট বিষয়টি আসলে কেমন? মনে করুন, এই পয়সা দুটি এন্ট্যাঙ্গেলড পার্টিক্যাল। এই দুটি পয়সার মধ্যে একটি পয়সাকে পৃথিবীতে রাখা হয়েছে এবং অন্য পয়সাটিকে মঙ্গল গ্রহে রাখা হয়েছে। এখন পৃথিবীতে রাখা পয়সাটিকে টস করার পর যদি হেড আসে, তবে মঙ্গল গ্রহে রাখা পয়সাতে টস করলে অবশ্যই টেইল আসবে। এবং পৃথিবীতে রাখা পয়সায় যদি টেইল আসে, তবে মঙ্গল গ্রহে রাখা পয়সায় হেড আসবে। এবং প্রতিবারই এমন হবে, এর উল্টো হবে না। একটি টেইল আসলে অপরটি হেড আসবেই। এবং এটিই হচ্ছে এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট।
সাব-অ্যাটোমিক পার্টিক্যাল যেমন ইলেকট্রনের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে স্পিন (Spin)। এই স্পিনের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সুপারপজিশন (Superposition)। অর্থাৎ, স্পিন একই সাথে আপ ও ডাউন দুই অবস্থাতেই থাকতে পারে। এবং স্পিনটি আপ না ডাউন অবস্থায় রয়েছে, তা দেখার চেষ্টা করা হলেই যেকোনো একটি নির্দিষ্ট অবস্থায় চলে আসে। সাব-অ্যাটোমিক পার্টিকেলের এই সুপারপজিশন ব্যবহার করে কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
যাই হোক, মনে করুন ইলেকট্রন এন্ট্যাঙ্গেল অবস্থায় রয়েছে। এখন এই দুইটি ইলেকট্রনের মধ্যে একটি অদ্ভুত যোগাযোগ থাকবে। একটি ইলেকট্রনকে মনে করুন পৃথিবীতে রাখা হয়েছে এবং অন্যটিকে চাঁদে। এখন পৃথিবীর ইলেকট্রনের স্পিন যখন দেখব, তখন যদি এতে আপ স্পিন পাওয়া যায়, তবে চাঁদে রাখা ইলেকট্রনে অবশ্যই ডাউন স্পিন পাওয়া যাবে। কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব? দুইটি এন্ট্যাঙ্গেলড পার্টিক্যাল কিভাবে তাদের মধ্যে যোগাযোগ বা কানেকশন বজায় রাখে? এতো দূরে থাকার সত্ত্বেও কিভাবে একটির ফলাফল আরেকটিকে প্রভাবিত করে? এই প্রশ্নের উত্তর এখনো বিজ্ঞানীদের কাছে স্পষ্ট নয়। তবে পার্টিকেলের এই বৈশিষ্ট্যের ফলে হয়তোবা ভবিষ্যতে হিউম্যান টেলিপোর্টেশন (Human Teleportation) সফলতা পেতে পারে বা বাস্তবে রূপ নিতে পারে। হয়তোবা!
৭. কোয়ান্টাম টানেলিং (Quantum Tunneling): জাদুর মতো ঘটনা
সাব-অ্যাটোমিক পার্টিকেলের আরও একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে কোয়ান্টাম টানেলিং (Quantum Tunneling)। হ্যারি পটারের এই দৃশ্য সবাই দেখেছেন। এখন যদি বলা হয় এটি আসলেই সম্ভব, তখন অবশ্যই কথাটি বিশ্বাস হবে না। কিন্তু সাব-অ্যাটোমিক পার্টিকেলের ক্ষেত্রে এটি আসলেই সম্ভব, যাকে বলা হচ্ছে কোয়ান্টাম টানেলিং। একটি দেওয়ালের একপাশে যদি আপনি ইলেকট্রন রাখেন, তবে দেওয়ালের অপর পাশে এই ইলেকট্রনটি খুঁজে পাবার সম্ভাবনাকে আপনি একদম শূন্য বলতে পারবেন না। কারণ ইলেকট্রন ওয়েবের মতো আচরণ করবে এবং ওয়েব যখন কোনো দেওয়ালে আঘাত করে, তবে এই ওয়েব একেবারে শেষ হয়ে যায় না। এর কিছুটা অংশ দেওয়ালের অপর পাশেও পাওয়া যায়। যেহেতু দেওয়ালের অপর পাশে ওয়েভ পাওয়া যাচ্ছে, সুতরাং ইলেকট্রনকে অপর পাশে পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। এই বিষয়টি যদিও জাদুর মতো মনে হচ্ছে, কিন্তু এটি ঘটছে। এবং এর ফলেই সূর্য আলো দিচ্ছে, সেই সাথে অনেক ইলেকট্রনিক ডিভাইস কাজ করছে। তবে এই বিষয়টি নির্ভর করে দেওয়াল বা ব্যারিয়ারের উচ্চতা, প্রশস্ততা এবং পার্টিকেলের ভরের উপর। এই কোয়ান্টাম টানেলিং নিয়ে একটি আলাদা ভিডিও করার ইচ্ছে রয়েছে। ভবিষ্যতে হয়তো বা করব।
উপসংহার
সাব-অ্যাটোমিক পার্টিকেলের অবস্থানের অনিশ্চয়তা, এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট, কোয়ান্টাম টানেলিং ইত্যাদি অদ্ভুত সব বৈশিষ্ট্যের জন্য কোয়ান্টাম ফিজিক্সকে বুঝেও মনে হয়, বুঝলাম না। এই ছিল কোয়ান্টাম ফিজিক্স নিয়ে আজকের উপস্থাপনা। আশা করি শব্দগত বা উচ্চারণগত যেকোনো ত্রুটি সহজ ভাবে দেখবেন। কোয়ান্টাম ফিজিক্স ব্যবহার করে কিভাবে কম্পিউটার তৈরি করা হয় এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটার কিভাবে বিশাল পরিসরে কাজ করতে পারে, তা জানতে এই ভিডিওটি দেখতে পারেন। সেই সাথে ভিডিও ভালো লাগলে বাঙ্গালা কথা চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করে রাখতে পারেন।
কীওয়ার্ডস: কোয়ান্টাম ফিজিক্স, কোয়ান্টাম মেকানিক্স, সাব-অ্যাটোমিক, ডবল স্লিট এক্সপেরিমেন্ট, ইন্টারফেয়ারেন্স প্যাটার্ন, ফটোইলেকট্রিক ইফেক্ট, ফোটন, ওয়েভ-পার্টিক্যাল দ্বৈততা, ইলেকট্রন, শ্রোডিঞ্জার ইকুয়েশন, প্রবাবিলিটি, কোপেনহেগেন ইন্টারপ্রিটেশন, এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট, সুপারপজিশন, কোয়ান্টাম টানেলিং, রিচার্ড ফাইনম্যান, আলবার্ট আইনস্টাইন, নীলস বোর, হাইজেনবার্গ, বিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা, মহাবিশ্বের রহস্য, প্রযুক্তি, কোয়ান্টাম কম্পিউটার।
