পৃথিবীর মানচিত্র বদলাতে চলেছে: আফ্রিকা মহাদেশের ফাটল ও নতুন মহাসাগরের জন্ম!
বন্ধুরা, আমি যদি আজকে আপনাদেরকে বলি যে, আমাদের পৃথিবীর ম্যাপ বদলাতে চলেছে, তাহলে কি আপনি সেটা বিশ্বাস করবেন? যদিও আমি এটা সত্যি কথাই বলছি। কারণ প্রকৃতি আমাদের আরও একটি মহাসাগর দিতে চলেছে। তার সঙ্গে সঙ্গে আমরা আরও একটা নতুন মহাদ্বীপও পেতে চলেছি। আর এই মন্তব্যগুলো আমি নয়, জিওলজিস্টরা করেছেন। এবং ওনারা এটাও বলেছেন যে, আফ্রিকা মহাদেশ আরও একটা টুকরোতে ভাঙতে চলেছে। আর এই টুকরোর মাঝখান দিয়ে একটি নতুন মহাসাগর চলে আসবে। আসলে দক্ষিণ-পশ্চিম কেনিয়াতে একটি বিশাল বড় ফাটল দেখা দিয়েছে, আর এই ফাটলটি দিন দিন আরও বড় হয়ে চলেছে, যে কারণে নাইরোবি-নারক হাইওয়ে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গিয়েছে। ভূমিকম্পের গতিবিধি এখানে আরও তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠেছে। এমনটা এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, কী হবে যদি একটা নতুন মহাসাগর তৈরি হয় পৃথিবীর ওপর? এর কী প্রভাব পড়বে? আর সব থেকে বড় প্রশ্ন এটাই যে, এই মহাসাগরটি তৈরি হতে কতদিন সময় লাগবে? আপনারাও যদি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে চান, তাহলে সঙ্গে থাকুন এবং আমাদের আজকের 'অদ্ভুত দশ'-এর এই ভিডিওটি শেষ পর্যন্ত দেখুন।
তো চলুন, শুরু করা যাক!
১. আফ্রিকা মহাদেশের বিভাজন: কেনিয়ার ফাটল
২০১৮ সালে বিজ্ঞানীদের সামনে হঠাৎ করে একটি প্রশ্ন উঠে আসে। আর সেটা হলো যে, কেনিয়ার কারণে কি আফ্রিকা মহাদেশ দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাবে? এবার সব থেকে বড় প্রশ্ন এটাই যে, জিওলজিস্টরা কেন এরকম আশঙ্কা করলো? চলুন সেটা জেনে নেওয়া যাক। আসলে কেনিয়ার নাইরোবি-নারক হাইওয়ের কাছে ৮ কিলোমিটার লম্বা একটি বিশাল বড় গর্ত তৈরি হয়েছিল। জিওলজিস্টদের মতে, তার কিছুদিন আগেই পৃথিবীর তলদেশে থাকা টেকটোনিক প্লেট নড়াচড়ার খবর পাওয়া গিয়েছিল। আর তারপরে কয়েক কিলোমিটার লম্বা এই গর্তের লাইন তৈরি হয়ে গিয়েছিল। ভূগর্ভ বৈজ্ঞানিকদের মতে, এই গর্ত আফ্রিকা মহাদেশকেই দুটি ভাগে বিভক্ত করবে না, বরং তার সঙ্গে এই গর্তের মধ্যে জলও ভর্তি হয়ে যাবে, যার ফলে আবার একটা নতুন মহাসাগরের সৃষ্টি হবে। আর তার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবী আরও একটা নতুন মহাদ্বীপও পাবে।
যদিও এরকম ঘটনা প্রথম প্রাকৃতিক ঘটনা নয়। জিওলজিস্টদের মতে, পৃথিবী খুবই দ্রুত গতিতে পরিবর্তন হচ্ছে। আর সেই সব পরিবর্তনগুলোর মধ্যে এমন পরিবর্তনও রয়েছে, যেগুলো আমাদের কখনোই চোখে পড়েনি। কেনিয়ার আগে ইথিওপিয়াতেও এরকমই গর্ত দেখতে পাওয়া গিয়েছিল। ২০০৫ সালে তৈরি হওয়া এই গর্ত জিওলজিস্টদের প্রায় হতবাক করে দিয়েছিল। কারণ কেবলমাত্র ১০ দিনের মধ্যেই ৭ কিলোমিটার গর্ত ৮ মিটার চওড়া হয়ে গিয়েছিল। এই ঘটনা কেবলমাত্র একটি ঘটনাই নয়, বরং এটি পৃথিবীবাসীর জন্য একটা ওয়ার্নিং ছিল।
২. ফাটলের কারণ: পৃথিবীর অভ্যন্তরের প্রক্রিয়া
কিন্তু প্রশ্ন হলো কেন? এর উত্তরে জিওলজিস্টরা বলেছেন যে, পৃথিবীতে ঘটা যেকোনো রকমের পরিবর্তন হতে কয়েক লক্ষ বছরের বেশি সময় লাগে। কিন্তু কেনিয়ার গর্তটা যথেষ্ট চিন্তাজনক। এই গর্তটাকে দেখে মনে হয় যেন আগত কিছু সময়ের মধ্যে পৃথিবীর পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে চলেছে। কারণ পৃথিবীর মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত গরম অংশগুলি পৃথিবীর উপরে উঠে আসছে, যেটা না কেবল আফ্রিকা মহাদেশকে দুই ভাগে ভাগ করবে, বরং এই দুটি মহাদ্বীপের মাঝখানে আরও একটা নতুন মহাসাগরের জন্ম দেবে। আজ থেকে ১৩ কোটি ৮০ লক্ষ বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকা এবং আফ্রিকা মহাদ্বীপ এভাবেই আলাদা হয়েছিল। এমনটাও মানা হচ্ছে যে, এই দুটি দেশের আলাদা হওয়ার রেজাল্ট এখন সামনে আসছে। এই দুটির সমুদ্রতটের দিকে যদি একটু ভালোভাবে লক্ষ্য করেন, তাহলে দেখতে পাবেন যে, এটা একটা বিশাল আকার দ্বীপ থেকে ভেঙে যাওয়া একটি অংশ। দক্ষিণ-পশ্চিম কেনিয়াতে আসা এই গভীর গর্ত রিফ্ট ভ্যালির পূর্ব দিকের অংশে রয়েছে, যেটা ইথিওপিয়া কেনিয়ার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
তবে এই গর্তটা তৈরি হওয়ার আসল কারণ কী? আসলে পৃথিবীর মানে ক্রাস্ট (Crust) আর ম্যান্টেলের (Mantle) উপরের অংশ অনেকগুলো টেকটোনিক প্লেটের (Tectonic Plates) দ্বারা ভাগ করা থাকে। এই প্লেটগুলি স্থির হয় না, এরা একে অপরের দিকে একটি নির্দিষ্ট গতিতে এগিয়ে যেতে থাকে। আর এই সবকিছুই হয় অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারের (Asthenosphere) নিচে। এমনটা মনে করা হয় যে, অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারের প্রভাব আর প্লেটের গতিবিধির কারণে তৈরি হওয়া বল এদের গতিমান করে রাখে। এই শক্তি না কেবল জেনারেল রূপেই চলে, বরং কখনো কখনো প্লেটগুলোকে ভেঙে দেয়। আর এর কারণে পৃথিবীর ভূভাগের ওপর গর্ত তৈরি হয়। তার সঙ্গে সঙ্গে নতুন আরেকটি প্লেট বাউন্ডারি হওয়ার রাস্তা তৈরি করে। ২০০৫ সালে এটা নোটিশ করা হয়েছে যে, আফ্রিকান প্লেট, সোমালি প্লেট (Somali Plate) এবং অ্যারাবিয়ান প্লেট (Arabian Plate) ধীরে ধীরে প্রতি বছর এক ইঞ্চি করে আলাদা হয়ে যাচ্ছে। এই কারণে ওই ফাঁকা জায়গায় জল ভর্তি হয়ে যাচ্ছে, যেটা সেখানে আরও একটা নতুন মহাসাগরের জন্ম দিচ্ছে। যদিও এই গর্তের পেছনে টেকটোনিক প্লেটের গতিবিধির কোনোই হাত নেই।
৩. ভবিষ্যৎ পৃথিবীর মানচিত্র: নতুন মহাদেশ ও পর্বতমালা
কিন্তু পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে জানা যায় যে, আগত এক কোটি বছরের মধ্যে আফ্রিকা সম্পূর্ণরূপে বদলে যেতে চলেছে। এবং এই আফ্রিকা ভাগ হয়ে নতুন নতুন মহাদ্বীপ, নতুন নতুন পর্বত শৃঙ্খলা এবং মহাসাগরের জন্ম হবে। এটি ইস্ট আফ্রিকার রিফ্ট ভ্যালির (East African Rift Valley) উপরের খাড়ি থেকে শুরু করে দক্ষিণ জিম্বাবোয়ে পর্যন্ত ৩০০০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। এটি আফ্রিকার প্লেটকে দুই ভাগে ভাগ করে দেয়। এই রিফ্ট ভ্যালির পূর্ব অংশে মানে ইথিওপিয়া, কেনিয়া, তানজানিয়ার ভূগর্ভস্থ নড়াচড়া যথেষ্ট তীব্র।
নর্থ আমেরিকান রিফ্ট (North American Rift) অর্থাৎ নর্থ আমেরিকার রিফটের নর্থ এন্ড থেকে শুরু করে সাউথ এন্ড পর্যন্ত কোটি বছর ধরে ভলকানিক বিস্ফোরণ হয়ে চলেছে। বিগত ৫০ বছর ধরে বিস্ফোরিত হয়ে চলেছে, আর এই কারণে এদেরকে পৃথিবীর সব থেকে অ্যাক্টিভ আগ্নেয়গিরি (Active Volcano) বলা হয়। এই ভলকানিক ব্লাস্টের কারণে এখন ওখানে রিফ্ট আর তার সঙ্গে সঙ্গে ভলকানিক পাথর দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু এর কারণে আর্থ ক্রাস্টের (Earth Crust) উধাও হওয়ার মধ্যে কী সম্পর্ক? আসলে পৃথিবীর সব থেকে উঁচু অংশটি তার ওপর অধিক বেশি ঠান্ডা হয়। যখন নিচের অংশ গরম হতে শুরু করে, তখন উপরের অংশটি ক্র্যাক হয়ে যায়। কারণ নিচের লেয়ার নিজের গরম বের করবার জন্য জায়গা খুঁজতে থাকে। তারপর সেটি বাইরের দিকে রিলিজ হতে থাকে। আর তারপর এখান থেকেই শুরু হয় গর্তের ফাটল পড়ার। এই ফাটল ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে, আর তারপর সেখানে জল পূর্ণ হতে থাকে।
এই ধরনের নড়াচড়া প্রথম কোনো ঘটনা নয়। হয়তো আপনারা এটা জানেন যে, ৩০০ মিলিয়ন বছর আগে সকল মহাদ্বীপ মিলে একটি মহাদ্বীপ ছিল, যেটার নাম ছিল 'প্যানজিয়া' (Pangaea)। এটাকে সুপারকন্টিনেন্টও (Supercontinent) বলা হয়। চলুন জেনে নেওয়া যাক এই বড় সুপারকন্টিনেন্ট থেকে এতগুলো সুপারকন্টিনেন্ট কিভাবে তৈরি হলো। যেমনটা আমি প্রথমেই বলেছি যে, পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেট সবসময় মুভ করতে থাকে। আর তার সঙ্গে সঙ্গে আর্থ ক্রাস্ট লিক হতে থাকে। আর এই প্রসেস যখন সমুদ্রের মাঝখানে হয়, তখন সেখানে একটি পাহাড় তৈরি হতে শুরু করে। তারপর যখন ম্যাগমা জলের কন্টাক্টে আসে, তখন সেটা পাথরে পরিণত হয়। তার সঙ্গে সঙ্গে আপনারা এটা জানলে অবাক হবেন যে, এর ফলে মহাসাগর সংকুচিত হতে থাকে। রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগর পৃথিবীর সব থেকে বড় মহাসাগর, যেটা প্রতি বছর ০.৫ স্কয়ার কিলোমিটারের গতিতে সংকুচিত হয়ে চলেছে। এই সব গতিবিধি চলাকালীন এটাই মনে হচ্ছে যে, আগত ১০০ মিলিয়ন বছর পর আবার সমস্ত কন্টিনেন্ট এক হয়ে যাবে, যেমনটা আগে প্যানজিয়া ছিল। এটা নিয়ে বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যদ্বাণীও করেছে। ওনাদের মতে, এই নতুন মহাদেশ তৈরি হতে এক কোটি বছর সময় লাগবে।
তবে এর আগে পূর্ব আফ্রিকা বাকি মহাদেশ থেকে একদম আলাদা হয়ে যাবে। পূর্ব আফ্রিকা রিফ্ট ভ্যালির সঙ্গে আফ্রিকা মহাদ্বীপ দুটি অংশে ভাগ হয়ে যাবে। প্রথমটা সোমালি প্লেট আর দ্বিতীয়টি নুবিয়ান প্লেট (Nubian Plate)। এর সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিম এশিয়াতে আরও একটা নতুন পর্বত সৃষ্টি হবে। পূর্ব আফ্রিকার অংশটি আলাদা হওয়ার কারণে আফ্রিকার মূল ভূখণ্ড থেকে আরবিয়ান প্লেট রাশিয়ান প্লেটে চলে যাবে। যে কারণে সবুজ মাঠের জমি পর্বতের রূপ নেবে। তার সঙ্গে সঙ্গে হিন্দ মহাসাগরে ছোট ছোট দ্বীপের সংখ্যা বেড়ে যাবে, যেগুলোকে সাধারণত টাপু বলা হয়। এই ছোট ছোট দ্বীপগুলো সোমালি এবং ইন্ডিয়ান-অস্ট্রেলিয়ান প্লেটের ধাক্কা লাগার পরে তৈরি হবে। এবং এর প্রভাব হিমালয়েও পড়বে। ইন্ডিয়ান-অস্ট্রেলিয়ান টেকটোনিক প্লেট উত্তর ইউরোসিয়ান প্লেটের দিকে যাবে, যেটার কারণে প্রতি বছর হিমালয় পর্বতটি এক সেন্টিমিটার করে বাড়তে থাকবে। আর এটি দক্ষিণের দিকে এগিয়ে যেতে থাকবে। আপনাদের জানার জন্য বলে দিই, ইন্ডিয়ান-অস্ট্রেলিয়ান প্লেটের সঙ্গে ইউরোসিয়ান প্লেটের ধাক্কা লাগার পর এই হিমালয়ের পর্বতমালা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ২০১২ সালে হওয়া একটি স্টাডি থেকে জানা গিয়েছে যে, ভারতীয় প্লেটের গতিবিধি উত্তর দিকে এগিয়ে চলেছে, যেটা আগত ২ কোটি বছর পর বন্ধ হয়ে যাবে।
তার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব আফ্রিকান ভ্যালি আলাদা হয়ে ইস্ট আফ্রিকান রিফ্ট ভ্যালিকেও দুটি টেকটোনিক প্লেটের দ্বারা আলাদা করে দেবে। সাধারণত এই রিফ্ট ভবিষ্যতে দুটি মহাদ্বীপের আলাদা হওয়ার সংকেত দেয়। যেমন ভাবে ফাটল বাড়তে থাকে, ঠিক তেমন ভাবেই ভূমির উপরের অংশ পাতলা হতে থাকে। এমন ভাবে একটি বড় মহাদেশ দুটি ভাগে ভাগ হয়ে যাবে, যে কারণে খালি হওয়া জায়গাগুলোতে মহাসাগরের জল ভর্তি হয়ে যাবে এবং হিন্দ মহাসাগরে আবার একটা নতুন মহাসাগরের জন্ম হবে।
উপসংহার
আর এটা কখন এবং কবে হবে, সেটা সময়ই বলে দেবে। তবে আপনাদের এই ব্যাপারে কী মতামত? অবশ্যই কমেন্ট বক্সে জানাবেন। আকাশ বর্মণ কয়েক মাস আগে এরকমই একটি বিষয়ে ভিডিও দিয়েছিলেন এবং সেখানে বলেছিলেন যে, আফ্রিকার গর্ত নিয়ে যদি আপনারা ভিডিও দেখতে চান, তবে অবশ্যই কমেন্ট করবেন। আপনারা কমেন্ট করেছেন এবং ভিডিওটি 'অদ্ভুত দশ'-এ দেওয়া হলো। আপনারা যদি আকাশ বর্মণের সেই ভিডিওটি না দেখে থাকেন, তবে অবশ্যই দেখবেন। লিঙ্ক ভিডিও ডেসক্রিপশনে দেওয়া থাকল।
কীওয়ার্ডস: পৃথিবীর মানচিত্র পরিবর্তন, নতুন মহাসাগর, নতুন মহাদ্বীপ, আফ্রিকা মহাদেশ, কেনিয়ার ফাটল, নাইরোবি-নারক হাইওয়ে, জিওলজিস্ট, টেকটোনিক প্লেট, রিফ্ট ভ্যালি, ইথিওপিয়া, সোমালি প্লেট, অ্যারাবিয়ান প্লেট, নুবিয়ান প্লেট, প্যানজিয়া, সুপারকন্টিনেন্ট, হিমালয় পর্বতমালা, ভূগর্ভস্থ নড়াচড়া, আগ্নেয়গিরি, গ্লোবাল ওয়ার্মিং, পরিবেশগত প্রভাব, প্রাকৃতিক ঘটনা, অজানা তথ্য, বিজ্ঞান।
