সমুদ্রের গভীরতা ও তার রহস্য: নিচে কী কী ভয়ঙ্কর প্রাণী লুকিয়ে আছে?

 

কি আছে সমুদ্রের সবচেয়ে নিচে ? সমুদ্রের গভীরতা সম্পর্কে আশ্চর্যজনক সত্য! How Deep is the Ocean ?

সমুদ্রের গভীরতা ও তার রহস্য: নিচে কী কী ভয়ঙ্কর প্রাণী লুকিয়ে আছে?

হেই বন্ধুরা! সমুদ্র এতটাই গভীর যে, সেটা আমাদের কল্পনার বাইরে। যদি আপনি পৃথিবীর প্রত্যেকটা মহাদেশের ভূপৃষ্ঠের বিল্ডিং, পাহাড়, পর্বত এবং যা যা রয়েছে, সবগুলোকে এক জায়গায় করে সমুদ্রের সবথেকে গভীর পয়েন্টে নিমজ্জিত করেন, তাহলে সেটি কেবলমাত্র ২ মাইল পর্যন্ত কভার করবে। এমনকি মাউন্ট এভারেস্ট পর্বতমালাকে যদি উল্টো করে সমুদ্রের গভীর পয়েন্টে ফেলা হয়, তাহলে সমুদ্রের কেবলমাত্র ১ শতাংশ স্পেস পূর্ণ হবে! আমাদের পৃথিবীর উপরিভাগে প্রায় ৭০ শতাংশ জল রয়েছে, আর এই ৭০ শতাংশ জলের মধ্যে আমরা কেবলমাত্র ৫ শতাংশ জলকেই ডিসকভার করতে পেরেছি। অর্থাৎ, সমুদ্র সম্পর্কে আমাদের কেবলমাত্র ৫ শতাংশই জ্ঞান রয়েছে। বাকি সমুদ্রের ৯৫ শতাংশে কী ধরনের অদ্ভুত প্রাণী লুকিয়ে রয়েছে, সেটা কেবলমাত্র আমাদের কাছে রহস্য। এটা বলা হয় যে, সমুদ্র মহাকাশের থেকেও অনেক বেশি গভীর এবং রহস্য দ্বারা পরিপূর্ণ।

আজকে বাঙ্গালা কথার এই ভিডিওটিতে আপনারা জানবেন সমুদ্রের গভীরতা কতটা, আর এই গভীর সমুদ্রের নিচে কী কী ভয়ঙ্কর প্রাণীরা বসবাস করে।

তো চলুন, শুরু করা যাক!

১. সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৪০০ মিটার পর্যন্ত: পরিচিতি ও রেকর্ড

এখন আপনারা যে ডটটি দেখতে পাচ্ছেন, এটা হলো এভারেজ হিউম্যান সাইজ। আর তার থেকে একটু বড় হলো হাতির সাইজ। আর এটা হলো পৃথিবীর সব থেকে বড় জাহাজ, যেটার নাম নক নেভিস (Knock Nevis)। আর পৃথিবীর সব থেকে বড় ট্যাংকার জাহাজ এটি। এবার চলুন, সমুদ্রের একটু গভীরে নামা যাক এবং দেখে নেওয়া যাক সমুদ্রের গভীরে কী কী রহস্য লুকিয়ে রয়েছে।

  • ৪০ মিটার গভীরতা: স্কুবা ড্রাইভারদের (Scuba Divers) ম্যাক্সিমাম গভীরতা বলে মনে করা হয়। ৪০ মিটারের নিচে যদি কেউ নামতে চায়, তাহলে তাকে নিজের ঝুঁকি নিতে হবে।

  • ৯৩ মিটার গভীরতা: লুসিটানিয়া (Lusitania) জাহাজের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যাবে।

  • ১০০ মিটার গভীরতা: স্কুবা ড্রাইভিং করা মানে মৃত্যুর সঙ্গে খেলা।

  • ২১৪ মিটার গভীরতা: হার্বার্ট নিটশ (Herbert Nitsch) নামের একজন ব্যক্তি ড্রাইভিংয়ের একটি রেকর্ড করেছেন।

  • ৩৩২ মিটার গভীরতা: আরও গভীরে নেমে একটি বিশ্ব রেকর্ড করেন আহমেদ গাবর (Ahmed Gabr) নামের একজন ব্যক্তি।

  • ৪৪৩ মিটার গভীরতা: এই গভীরতা ঠিক ততটা, যতটা ইউএসএর স্টেট বিল্ডিংয়ের নিচ থেকে উপর পর্যন্ত দেখতে পাওয়া যায়।

২. ৫০০ মিটার থেকে ১০০০ মিটার পর্যন্ত: তিমি, সাবমেরিন ও স্কেরি জোন

  • ৫০০ মিটার গভীরতা: ব্লু হোয়েলদের (Blue Whales) জন্য এই স্থান। এই স্থানে ব্লু হোয়েল নির্দ্বিধায় সাঁতার কাটতে থাকে। আর এই ৫০০ মিটার গভীরতা হলো ব্লু হোয়েলদের জন্য কমফোর্ট জোন। এর থেকে নিচের দিকে নামলে তাদের লাংগস (Lungs) ফাটতে পারে। এর কারণ হলো নিচের জলের চাপ অনেক বেশি। কারণ, যত সমুদ্রের নিচের দিকে নামতে থাকবেন, জলের চাপও তত বৃদ্ধি হতে থাকবে। পৃথিবীর সব থেকে বড় ক্রিয়েচার হলো ব্লু হোয়েল, আর এর ওজন প্রায় ১ লক্ষ ৮০ হাজার কেজি। এত বিশাল আকৃতির প্রাণী হওয়া সত্ত্বেও এই ব্লু হোয়েল ৫০০ মিটারের নিচের গভীরতা সহ্য করতে পারবে না। এরা কেবলমাত্র ৫০০ মিটার পর্যন্তই সাঁতার কাটতে পারবে। এমনকি আমেরিকার সব থেকে অ্যাডভান্স নিউক্লিয়ার সাবমেরিন (Nuclear Submarine) 'সি উলফ' (Sea Wolf) ৫০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত যেতে পারে। কারণ এর থেকে বেশি নিচের দিকে যদি নামে, তাহলে জলের প্রেসারের কারণে সাবমেরিনে ক্র্যাক (Crack) আসতে পারে।

  • ৫৩৫ মিটার গভীরতা: এম্পেরর পেঙ্গুইনরা (Emperor Penguins) সাঁতার কাটে। অর্থাৎ, এদের মধ্যেও এই ক্যাপাবিলিটি রয়েছে, যেটার সাহায্যে তারা সমুদ্রের এত গভীরে টিকে থাকতে পারে। কিন্তু এত গভীরে যদি কোনো মানুষ নামে, তার উপর জলের চাপ ঠিক ততটাই থাকবে, ঠিক যতটা একটা হাতিকে তার মাথার উপর চাপিয়ে দিলে হবে।

  • ৮৩০ মিটার গভীরতা: এই গভীরতায় নামা মানে পৃথিবীর সবথেকে উঁচু বিল্ডিং বুর্জ খলিফার (Burj Khalifa) উচ্চতার মতো গভীরে নামা হবে। এই জায়গাটি সমুদ্রের এমন একটি গভীর স্থান, যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না।

  • ১০০০ মিটার গভীরতা: সমুদ্রের এত গভীর স্থানকে 'স্কেরি জোন' (Scary Zone) বলা হয়। আর এখান থেকেই শুরু হয় সমুদ্রের ভয়ঙ্কর রহস্য। এই স্থানে সূর্যের কিরণ পৌঁছায় না। এই জায়গাটি অন্ধকারে একদম আচ্ছন্ন থাকে। এই জায়গায় জলের চাপ প্রায় ১৫০০ পিএসআই (PSI), মানে এখানে জলের চাপ এতটাই বেশি থাকে, যেটা আপনার কল্পনার বাইরে। এই স্কেরি জোনে জায়ান্ট স্কুইডের (Giant Squid) মতো ভয়ঙ্কর প্রাণী পাওয়া যায়, যারা গভীর সমুদ্রের সব থেকে ভয়ঙ্কর প্রাণী।

৩. ২০০০ মিটার থেকে ৬০০০ মিটার পর্যন্ত: ড্রাগন ফিশ, টাইটানিক ও হেডিস জোন

  • ১২৮০ মিটার গভীরতা: এখানে পাওয়া যাবে লেদারব্যাক সি কচ্ছপ (Leatherback Sea Turtle)। এই কচ্ছপগুলি পৃথিবীর সব থেকে বড় প্রজাতির কচ্ছপ আর এদের ওজন প্রায় ৭০০ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। এই জায়গার জলের চাপ এতই বেশি যে, নিমেষেই মানুষের দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে।

  • ২০০০ মিটার গভীরতা: এখানে দেখতে পাওয়া যাবে ব্ল্যাক ড্রাগন ফিশ (Black Dragonfish)। সবথেকে মজার বিষয় কী জানেন? এই প্রাণীটি এমনিতেই কালো রঙের, তার সঙ্গে এই জায়গার জল অন্ধকারাচ্ছন্ন, তাই এদেরকে দেখা যায় না। যদি ফ্ল্যাশ লাইট মারা হয়, তবে এদেরকে দেখা যাবে।

  • ২২৫০ মিটার গভীরতা: এখানে রয়েছে স্পার্ম ওয়েল (Sperm Whale) আর কলোসাল স্কুইডের (Colossal Squid) মতো ভয়ঙ্কর প্রাণী। কলোসাল স্কুইড ১৪ মিটার লম্বা হয়ে থাকে। যে পাত্রে আমরা খাওয়ার খাই, ওই পাত্রের সাইজের হয় এদের চোখ। এই কারণে এরা অন্ধকারেও দেখতে পায়। এদের 'সি মনস্টার'ও (Sea Monster) বলা হয়ে থাকে। স্পার্ম ওয়েল আর কলোসাল স্কুইডের মধ্যে মাঝে মাঝে ভয়ঙ্কর লড়াই হয়ে থাকে। কলোসাল স্কুইড স্পার্ম ওয়েলের শরীরে দাগ বসিয়ে দেয়। এই স্পার্ম ওয়েলের শরীরে যে দাগগুলো দেখতে পাচ্ছেন, এগুলো সি মনস্টারের আঘাত।

  • ৩৮০০ মিটার গভীরতা: এখানে পাওয়া যাবে বিখ্যাত জাহাজ আরএমএস টাইটানিকের (RMS Titanic) ধ্বংসাবশেষ।

  • ৪০০০ মিটার গভীরতা: এই গভীরতায় নামলে আমরা সমুদ্রের 'অ্যাবিসাল জোন'-এ (Abyssal Zone) পৌঁছে যাবো। এই জায়গায় জলের প্রেসার ১১,০০০ পাউন্ড পার স্কোয়ার ইঞ্চিতে থাকে। আর এখানে থাকে সমুদ্রের এমন সব দানব, যারা বড় বড় জাহাজকে নিমেষেই গিলে নিতে পারবে। এখানকার জলের প্রেসার মাপার জন্য একটি হাতিকে ছোট একটি ৫ টাকার কয়েনের উপর দাঁড় করিয়ে তুলনা করতে পারেন।

  • ৪৭৮১ মিটার গভীরতা: এখানে পাওয়া যাবে যুদ্ধ জাহাজের ধ্বংসাবশেষ, যেগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানিরা টর্পেডো মেরে ডুবিয়ে দিয়েছিল।

  • ৬০০০ মিটার গভীরতা: আরও নিচে নামলে সমুদ্রের এমন এক অংশ শুরু হয়, যেটাকে 'দ্য হ্যাডাল জোন' (The Hadal Zone) বলা হয়ে থাকে। হ্যাডাল নামটি এসেছে প্রায় গ্রিক ধর্মের মৃত্যুর দেবতা হেডিসের (Hades) থেকে। মনে করা হতো, মৃত্যুর পর হেডিস, পাপীদের সমুদ্রের গভীরে নিয়ে যেত, যেখানে নরক রয়েছে। এই জলের প্রেসার সমুদ্রের উপর থেকে ১১,০০০ গুণ বেশি হয়ে থাকে। অর্থাৎ, এখানে জলের প্রেসার এতটাই বেশি থাকে, যা একটি বুলেট প্রুফ কারকে ভেঙে দিতে পারে।

৪. ৬০০০ মিটার থেকে ১১০০০ মিটার পর্যন্ত: মানব অভিযান ও চ্যালেঞ্জার ডিপ

  • ৬৫০০ মিটার গভীরতা: ইউএসএর রিসার্চ সাবমেরিন (Research Submarine) যেতে পারবে। এই সাবমেরিনের সাহায্যেই টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষকে খুঁজে বের করা হয়েছিল।

  • ৮৮৪০ মিটার গভীরতা: এই গভীরতায় গোটা মাউন্ট এভারেস্ট উল্টো করে রাখা যাবে।

  • ১০,৮৯৮ মিটার গভীরতা: এমন একটি জায়গা, যেখানে জেমস ক্যামেরন (James Cameron) ২০১২ সালে সাবমেরিন নামিয়েছিল। কিন্তু ১৯৩০ সালে ডন ওয়ালস (Don Walsh) এবং জ্যাক পিকার্ড (Jacques Piccard) নামের দুই ব্যক্তি এর থেকেও গভীর নামার রেকর্ড করেছিল। এই দুইজন ১০,৯১৬ মিটার গভীর পর্যন্ত সাবমেরিন নামিয়েছিল। সাবমেরিনটাকে এই স্থানে নামাতে প্রায় ৫ ঘণ্টা সময় লেগেছিল। কিন্তু এখানে জলের প্রেসার এতই বেশি ছিল যে, সাবমেরিনে ক্র্যাক পড়তে শুরু করে। তাই দ্রুত তাদের সেখান থেকে পালিয়ে আসতে হয়।

  • ১০,৯৭২ মিটার গভীরতা: ঠিক ততটা গভীরতা হয়, যতটা উচ্চতায় কোনো কমার্শিয়াল প্লেন (Commercial Plane) ফ্লাই করে। প্লেনের উইন্ডো থেকে ভূপৃষ্ঠের দিকে তাকালে সমুদ্রের গভীরতা ঠিক সেই ফীল পাওয়া যায়।

  • ১১,০০০ মিটার গভীরতা: সমুদ্রের যে সর্বোচ্চ নিচ পর্যন্ত মানুষ ডিসকভার করতে পেরেছিল, তা হলো ১১,০০০ মিটার। যিনি এই পর্যন্ত নেমেছিলেন, তার নাম ভিক্টর ভেসকোভো (Victor Vescovo)। তিনি লিমিটিং ফ্যাক্টর (Limiting Factor) মেশিনে বসে একাই ১১,০০০ মিটার গভীর পর্যন্ত গিয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়েন। সমুদ্রের এই জায়গাটি 'চ্যালেঞ্জার ডিপ' (Challenger Deep) নামে পরিচিত। আর এটি গুয়াম আইল্যান্ড (Guam Island) থেকে ৩০০ কিমি দূরে অবস্থিত।

উপসংহার

সমুদ্রের উপর থেকে ১১,০০০ মিটার নিচে পর্যন্ত নামার পরেও বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এটাই সমুদ্রের গভীরতম পয়েন্ট নয়। সমুদ্র আরও গভীর, যেটা এখনো ডিসকভার করা যায়নি। তারা মনে করেন, কেবলমাত্র সমুদ্রের ৫ শতাংশই এক্সপ্লোর করা সম্ভব হয়েছে। বাকি ৯৫ শতাংশের অংশে কী রহস্য লুকিয়ে রয়েছে, তা আমাদের কাছে কেবলমাত্র অজানা। ভবিষ্যতে হয়তো এই রহস্যের সমাধান করে ফেলা সম্ভব হবে। তখন হয়তো আমরা এমনও ভয়ঙ্কর প্রাণীর সন্ধান পাবো, যা আমাদের কল্পনার বাইরে হবে।

তো বন্ধুরা, আজকের ভিডিওটি এইটুকুই। যদি ভালো লেগে থাকে, তবে অবশ্যই লাইক, কমেন্ট এবং শেয়ার করবেন। পাশাপাশি বাঙ্গালা কথা চ্যানেলে নতুন হলে অবশ্যই বেল আইকনটিতে প্রেস করে নেবেন। এরকমই ইন্টারেস্টিং ভিডিও সবার আগে দেখতে।

সর্বশেষে থ্যাঙ্কস ফর ওয়াচিং, স্টে হ্যাপি, স্টে কুল।

নবীনতর পূর্বতন

نموذج الاتصال