রিউগিয়ং হোটেল: উত্তর কোরিয়ার অভিশপ্ত স্বপ্ন, কেন আজও খালি পড়ে আছে?

রিউগিয়ং হোটেল: উত্তর কোরিয়ার অভিশপ্ত স্বপ্ন, কেন আজও খালি পড়ে আছে?

রিউগিয়ং হোটেল: উত্তর কোরিয়ার অভিশপ্ত স্বপ্ন, কেন আজও খালি পড়ে আছে?

হেই বন্ধুরা, আকাশছোঁয়া এই ত্রিভুজ আকারের স্ট্রাকচারটিকে দেখতে তো অনেক আধুনিক, বিলাসবহুল এবং সুন্দর লাগে। কিন্তু আপনি যখন এই বিল্ডিংয়ের করুণ গল্পগুলো শুনবেন, তখন আপনিও সেটাকে বিশ্বাস করতে চাইবেন না। ১০৮০ ফুট উঁচু এবং তার আশেপাশের অন্যান্য বিল্ডিংয়ের চেয়ে দশ গুণ উঁচু এই বিল্ডিংটিকে দেখতে অনেকটা পিরামিডের মতো লাগে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা আসলে একটি হোটেল, যেটা আইফেল টাওয়ারের থেকেও উঁচু। এরিয়া অনুযায়ী এই হোটেলটি ৩৯ লক্ষ ফিট জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। শুধু তাই নয়, এই হোটেলে মজুত রয়েছে ৩০০০টি রুম, যার ফলে পৃথিবীর অন্যান্য নামিদামি হোটেলের সাথে এটা খুব সহজেই মোকাবিলা করতে পারে। রাতের বেলায় বুর্জ খলিফার মতো এই হোটেলের দেওয়ালেও লাইট শো ও ফায়ার ওয়ার্কস হয়ে থাকে, যা পুরো শহরটিকে রঙিন আলোয় আলোকিত করে তোলে। এই হোটেলের ভেতরে কী মজুত রয়েছে আর এটা কতটা সুন্দর, তাতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই। বরং আশ্চর্যের বিষয় হলো, আজ পর্যন্ত এই হোটেলে একজন লোকও প্রবেশ করেনি। বিগত ৩০ বছর ধরে এই হোটেল খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে একদম একা দাঁড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো কেন? কেন আজ পর্যন্ত কেউ এই হোটেলে আসেনি? সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা খরচ করে তৈরি করা এই হোটেল পৃথিবীর কোন স্থানে অবস্থিত? আসুন এই সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

আমি জানি, আপনাদের মধ্যে অনেকেই ভাবছেন যে, এই অসাধারণ হোটেলটির সম্পর্কে আপনারা এখনো অবধি জানেন না কেন? তার মুখ্য কারণ হলো, রিউগিয়ং নামের এই ১০৫ তলা বিশিষ্ট হোটেলটি উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ংইয়ং-এ (Pyongyang) বিগত ৩০ বছর ধরে একা দাঁড়িয়ে রয়েছে।

১. উত্তর কোরিয়ার শাসন ব্যবস্থা ও বিচ্ছিন্নতা

আপনারা হয়তো অনেকেই জানেন, উত্তর কোরিয়া এমন একটি কান্ট্রি, যারা নিজেদেরকে ডেমোক্রেটিক (Democratic) বলে দাবি করে থাকে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি এমন একটি দেশ, যেটাকে ১৯৪৮ সাল থেকে শুধুমাত্র একটি পরিবার চালিয়ে আসছে – কিম পরিবার। বিগত ৭৪ বছর ধরে উত্তর কোরিয়াতে জোর করে রাজত্ব করছে। হয়তো উত্তর কোরিয়াই একমাত্র দেশ, যেখানে প্রতিবছর নির্বাচন হয় ঠিকই, কিন্তু ক্যান্ডিডেট একজনই থাকে, আর সেই ক্যান্ডিডেট হলো উত্তর কোরিয়ার সুপ্রিম লিডার অর্থাৎ কিম পরিবারেরই একজন। শক্ত নিয়ম-কানুনের কারণে উত্তর কোরিয়ার অনেক শত্রু রয়েছে। আর এই জন্যই এদের না রয়েছে অন্য কান্ট্রির সাথে কোনো রকম ট্রেড রিলেশন, আর না এখানে অন্য দেশ থেকে টুরিস্ট আসতে পছন্দ করে।

প্রতিবছর উত্তর কোরিয়াতে ৩ লক্ষ ভিজিটর ঘুরতে আসে। এটা যদি আপনাদের অনেক বেশি মনে হয়, তাহলে এর পাশের দেশ অর্থাৎ দক্ষিণ কোরিয়াতে প্রতিবছর ১৭৫ লক্ষ ভিজিটর ঘুরতে আসে, যা উত্তর কোরিয়ার তুলনায় অনেকটাই বেশি। এবার হয়তো আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগছে যে, উত্তর কোরিয়াতে যখন এত শক্ত নিয়ম-কানুন, আর এখানে ভিজিটরও অনেক কম আসে, তাহলে ৩০০০ রুম বিশিষ্ট এত বিশাল হোটেলের কী প্রয়োজন?

২. স্নায়ুযুদ্ধ ও উচ্চতার প্রতিযোগিতা

আসলে ঘটনাটি ১৯৮৬ সালের, যখন ইউনাইটেড স্টেট এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে কোল্ড ওয়ার (Cold War) চলছিল। কোল্ড ওয়ারে উত্তর কোরিয়া, সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে কাজ করছিল, যেখানে এর প্রতিবেশী দেশ অর্থাৎ দক্ষিণ কোরিয়া আমেরিকার পক্ষে ছিল। আর যেহেতু এটা কোল্ড ওয়ার ছিল, তাই এখানে কোনো অস্ত্রের ব্যবহার নয়, বরং নিজেদের ক্ষমতা তুলে ধরাই ছিল সবার মূল লক্ষ্য। যার ফলে উত্তর এবং দক্ষিণ কোরিয়া একে অপরের শত্রু হয়ে গিয়েছিল, আর প্রত্যেক ক্ষেত্রে একে অপরের চেয়ে এগিয়ে থাকার চেষ্টা করছিল।

দক্ষিণ কোরিয়া সিঙ্গাপুরে পৃথিবীর সবথেকে উঁচু হোটেল তৈরি করে, যেটা আজ স্ট্যামফোর্ড হোটেল (Stamford Hotel) নামে পরিচিত। এছাড়াও দক্ষিণ কোরিয়া ১৯৮৮ সালের অলিম্পিকের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সেই সময়কার পৃথিবীর সব থেকে উঁচু হোটেল এবং ১৯৮৮ সালের অলিম্পিকের কারণে দক্ষিণ কোরিয়া পুরো পৃথিবীতে সুনাম অর্জন করতে শুরু করে। কিন্তু উত্তর কোরিয়া এটি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিল না। তাই উত্তর কোরিয়াও সেই সময় একটি বিশাল ফেস্টিভ্যালের আয়োজন করতে যাচ্ছিল, যে অলিম্পিকের পুরোপুরি ভাবে একটি কপি ভার্সন ছিল।

এই ফেস্টিভ্যালটিকে ১৯৮৯ সালে করার কথা ছিল। আর এই ফেস্টিভ্যালে অংশগ্রহণ করা ২২ হাজার পার্টিসিপেন্টদের জন্য এবং দেড় লক্ষ লোক বসতে পারে এমন একটি ব্র্যান্ড নিউ স্টেডিয়াম এবং ৩০০০ রুম বিশিষ্ট একটি হোটেল বানানোর সিদ্ধান্ত নেয় উত্তর কোরিয়া। এই হোটেল ১০৫ তলা বিশিষ্ট হতো, যেটা দক্ষিণ কোরিয়ার স্ট্যামফোর্ড হোটেলের ওয়ার্ল্ড রেকর্ডকে ভেঙে নিজের নামে করে নিত। শুধু তাই নয়, সেই সময় পুরো পৃথিবীতে ২১টি বিল্ডিং এমন ছিল, যার ফ্লোর ১০০ তলার উপরে ছিল, আর তাদের মধ্যে রিউগিয়ং হোটেল ছিল সবার উপরে। দক্ষিণ কোরিয়ার থেকে নিজেকে উপরে রাখার জন্য উত্তর কোরিয়া এইসব ঘোষণা খুব জোরদার করে করে দিয়েছিল।

৩. নির্মাণে বাধা ও আর্থিক সংকট

কিন্তু এত উঁচু হোটেল বানানোর স্বপ্ন তাদের গলায় কাঁটা আটকানোর মতো আটকে গিয়েছিল। এত উঁচু বিল্ডিং বানানোর জন্য অসংখ্য স্টিলের প্রয়োজন হতো, কিন্তু পর্যাপ্ত স্টিল উত্তর কোরিয়ার কাছে মজুত ছিল না। আর এই হোটেলের একদম উপরের রেস্টুরেন্ট ও পৃথিবীর সবথেকে উঁচু অবজারভেশন ডেক (Observation Deck) বানানোর কথা ছিল। এই হোটেলে যে মডার্ন ফেসিলিটি রাখার কথা ছিল, যদি উত্তর কোরিয়া তা রাখতে পারতো, তাহলে শুধুমাত্র দক্ষিণ কোরিয়াকেই নয়, বরং পুরো পৃথিবীর সুনাম অর্জন করতে পারতো।

১৯৮৭ সালে হোটেলের কনস্ট্রাকশনের কাজ শুরু করা হয়। কিন্তু যখন ১৯৮৯ সালে ওয়ার্ল্ড ফেস্টিভ্যাল শুরু হয়, তখন ৩০০০ রুম বিশিষ্ট এই হোটেলের নির্মাণ কাজ অর্ধেকও কমপ্লিট হয়নি। তখন সম্মান বাঁচানোর জন্য উত্তর কোরিয়া বলে, সমস্যার কারণে কনস্ট্রাকশন সাইটের কাজ ধীর গতিতে এগোচ্ছে। কিন্তু উত্তর কোরিয়া হার না মেনে হোটেলের ওপেনিংয়ের একটি নতুন ডেট অ্যানাউন্সমেন্ট করে। এবার হোটেলের নতুন ওপেনিং ডেট উত্তর কোরিয়ার সুপ্রিম লিডার কিম ইল সুং-এর (Kim Il-sung) ৮০তম জন্মদিনে খোলার কথা ছিল, আর সেটি ছিল ১৯৯২ সাল।

কনস্ট্রাকশন সাইটের কাজ পুনরায় জোরদমে চালু করা হয়। কিন্তু ভাগ্য কোনোভাবেই উত্তর কোরিয়ার সাথে ছিল না। উত্তর কোরিয়ার সমস্ত কোল্ড ওয়ারের সম্পর্ক সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ছিল। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায় এবং তার কারণে উত্তর কোরিয়ার ইকোনমি সম্পূর্ণভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। এমন সময় তাদের কাছে কোনো সাপোর্ট ছিল না। আর তার পাশাপাশি অতটা অর্থও মজুত ছিল না, যা দিয়ে এই বিল্ডিংয়ের কনস্ট্রাকশনের কাজ কন্টিনিউ চলবে। তাই বিল্ডিংয়ের কনস্ট্রাকশনের কাজ শেষ হওয়ার আগেই তা স্থগিত করে দেওয়া হয়। হোটেলের ওপেনিংয়ের যে আশ্বাস সবাইকে দেওয়া হয়েছিল, উত্তর কোরিয়ার সেটাই দ্বিতীয়বারের মতো ফেল হয়ে যায়। এর ফলে পৃথিবী জুড়ে উত্তর কোরিয়া হাসির ঠাট্টার কারণ হয়।

৪. 'ফ্যান্টম হোটেল' থেকে নতুন প্রচেষ্টা

আর বিগত ১৬ বছর যাবত এই স্ট্রাকচার একই ভাবে দাঁড়িয়ে আছে, যা উত্তর কোরিয়ার সৌন্দর্য বাড়ানোর পরিবর্তে উত্তর কোরিয়ার মুখে একটি কালো দাগের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। কারণ এই বিল্ডিংয়ে না তো কোনো পেইন্ট করা হয়েছিল, না তো লাগানো হয়েছিল এতে কোনো উইন্ডো প্যানেল। একসময় এসে এই সম্পূর্ণ স্ট্রাকচারটিকে ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এতে পুরো পৃথিবীর মানুষ মনে করতো, উত্তর কোরিয়ার কাছে একটি বিল্ডিং বানানোর মতো ক্ষমতা নেই। এই জন্য এটিকে এভাবেই ফেলে রাখা তাদের কাছে আর কোনো অপশন ছিল না।

এরপর অনেক বছর পর ২০০৮ সালে একটি ইজিপশিয়ান কোম্পানির (Egyptian Company) সাথে ডিল করা হয়, যারা তাদের নিজেদের অর্থ দিয়ে কনস্ট্রাকশনের কাজ সম্পন্ন করবে আর বিল্ডিংটাকে পরিচালনাও করবে। উত্তর কোরিয়ার সুপ্রিম লিডার কিম ইল সুং সেই সময় মারা গিয়েছিল। কিন্তু আরও একবার হোটেলের ওপেনিংয়ের সময় সুপ্রিম লিডারের ১০০তম জন্মদিন অর্থাৎ ২০১২ সালে রাখা হয়। ইজিপশিয়ান কোম্পানি সর্বপ্রথম বিল্ডিংটিতে উইন্ডো প্যানেল লাগায়, যাতে এটি সৌন্দর্য নষ্ট না করে। কিন্তু যখন হোটেলের ইন্টেরিয়র ডিজাইন করার সময় আসে, তখন আরও একটি বড় সমস্যা দেখা দেয়।

২০১১ সালে যখন কিম জং উন (Kim Jong Un) উত্তর কোরিয়ার নতুন লিডার হয়, তখন তিনি এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেন, যার ফলে আমেরিকা উত্তর কোরিয়াতে লাক্সারি আইটেম ইমপোর্ট করা বন্ধ করে দেয়। হোটেলের ভিতরের দৃশ্য চমৎকার করবার জন্য যেসব আসবাবপত্রের প্রয়োজন হতো, তা উত্তর কোরিয়া ইমপোর্ট করতে পারছিল না। হোটেলের নতুন ওপেনিং ডেটে এটি ওপেন করা তো দূরের কথা, এটি দেখার মতো অবস্থাতেও ছিল না। ফলে আরও একবার উত্তর কোরিয়া খারাপ ভাবে হেরে যায়। পৃথিবীর সব থেকে উঁচু হোটেল তো দূরের কথা, এখন এই হোটেলটিকে একটি নতুন ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে যুক্ত করা হয়েছে। গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড অনুযায়ী, এটি পৃথিবীর সব থেকে বড় বিল্ডিং, যেটি একদম খালি পড়ে রয়েছে। আজও এই হোটেলের দেওয়ালে রাতের বেলায় চমৎকার রঙিন আলো দেখতে পাওয়া যায়, কিন্তু আজও এই হোটেলটির ভেতর নিস্তব্ধ এবং খালি পড়ে রয়েছে।

উপসংহার

আপনাদের কী মত, এই হোটেলটি কি সম্পূর্ণ হতে পারবে? এবং যদি সম্পূর্ণ হয়, তাহলে কি আপনিও উত্তর কোরিয়ার এই হোটেলে গিয়ে একদিন থাকতে চাইবেন? অবশ্যই কমেন্ট বক্সে জানাবেন। পাশাপাশি 'bangalakotha' চ্যানেলে নতুন হলে অবশ্যই সাবস্ক্রাইব করে বেল আইকনটিতে প্রেস করে নেবেন, এরকমই ইন্টারেস্টিং ভিডিও সবার আগে দেখতে।

কীওয়ার্ডস: রিউগিয়ং হোটেল, উত্তর কোরিয়া, পিয়ংইয়ং, অভিশপ্ত হোটেল, ফ্যান্টম হোটেল, কিম পরিবার, স্নায়ুযুদ্ধ, অলিম্পিক, নির্মাণ ব্যর্থতা, আর্থিক সংকট, কিম ইল সুং, কিম জং উন, গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড, পরিত্যক্ত বিল্ডিং, উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতি, পর্যটন, স্থাপত্য, ব্যর্থ প্রকল্প।

নবীনতর পূর্বতন

نموذج الاتصال