![]() |
| ব্ল্যাক হোলের ভিতরে কি আছে ? ছবি canva.com |
ফ্রীতে ডিসাইন পেতে এখানে যান
ব্ল্যাক হোল: মহাজগতের সবচেয়ে অদ্ভুত, রহস্যময় ও শক্তিশালী জিনিস!
হেই বন্ধুরা! এই মহাজগতের সবচেয়ে অদ্ভুত, সবচেয়ে রহস্যময় এবং সবচেয়ে শক্তিশালী জিনিসটি হচ্ছে ব্ল্যাক হোল (Black Hole)। ব্ল্যাক হোল যেকোনো স্টারকে গ্রাস করে ফেলতে পারে। ব্ল্যাকহোলে রয়েছে পাওয়ারফুল জেট, যা ম্যাটারকে প্রায় আলোর বেগে দূরে নিক্ষেপ করে।
ব্ল্যাকহোলের প্রথম ধারণা আসে ম্যাথমেটিক্যাল ইকুয়েশন থেকে, যা ওই সময়ের জন্য ছিল একটি গাণিতিক ধাঁধা। ব্ল্যাক হোলের মতো জিনিস বাস্তবে এক্সিস্ট করতে পারে, আলবার্ট আইনস্টাইন কখনোই তা মেনে নিতে পারেননি। বহু বছর মানুষ বিশ্বাস করতে চায়নি যে ব্ল্যাক হোলের মতো কিছু থাকতে পারে। কারণ ব্ল্যাক হোল হচ্ছে এমন একটি ধারণা যা দেখা যায় না, যেখানে ফিজিক্সের কোনো সূত্র কাজ করে না, যেখানে যেকোনো বস্তু চিরতরে হারিয়ে যায়, যা বাস্তবতার সম্পূর্ণ বিপরীত।
তবে সময়ের সাথে সাথে আমরা জেনেছি ব্ল্যাক হোল বাস্তবে এক্সিস্ট করে। কিন্তু এই ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণ গহ্বর আসলে কী? আমরা কিভাবে ব্ল্যাক হোলের অস্তিত্ব যে রয়েছে তা নিশ্চিত হয়েছি? কিভাবে ব্ল্যাকহোল কিংবা সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল তৈরি হয়? এবং আমাদের উপর এর কী প্রভাব রয়েছে? চলুন, আজকের এই পোস্টে বাঙ্গালা কথা আপনাদের এই সকল প্রশ্নেরই উত্তর জানাবে।
১. ব্ল্যাক হোল আসলে কী?
আমাদের মধ্যে অনেকেই মনে করেন ব্ল্যাক হোল হচ্ছে একটি গোলক আকৃতির বস্তু। কিন্তু না। ব্ল্যাক হোল হচ্ছে একটি গোলক আকৃতির স্পেস বা স্থান। সেখানে কোনো কিছু নেই, সম্পূর্ণ শূন্যস্থান। তবে ব্ল্যাকহোলে রয়েছে খুবই শক্তিশালী গ্রাভিটি।
আইনস্টাইনের জেনারেল রিলেটিভিটি (General Relativity) অনুযায়ী, ভরের কারণে স্পেস বেঁকে যায় এবং এর ফলে মহাকর্ষ বল অনুভূত হয়। এখন জেনারেল রিলেটিভিটির সূত্রমতে, যদি খুবই ক্ষুদ্র স্থানে বিশাল ভরের বস্তু থাকে, তবে সেখানে স্পেসের বক্রতা হবে এক্সট্রিম। ফলে ওই এক্সট্রিম বক্রতায় কোনো বস্তু পতিত হলে বস্তুটির ক্ষেত্রে কী ঘটবে? এমন প্রশ্নে জেনারেল রিলেটিভিটির সূত্র থেকে কী সমাধান পাওয়া যায়, তা জানা ছিল না।
কিন্তু ১৯১৫ সালে জেনারেল রিলেটিভিটি প্রকাশের মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে কার্ল শর্টশিল্ড (Karl Schwarzschild) এই সমস্যার সমাধান করেন। কার্ল শর্টশিল্ড ম্যাথমেটিক্যালি দেখান যে, বিশাল ভরের কোনো বস্তু যেমন একটি তারার সম্পূর্ণ ভরকে যদি একটি সিঙ্গেল পয়েন্টে নিয়ে আসা হয়, তবে স্পেস-টাইমের বক্রতা হবে এক্সট্রিম। এবং এই এক্সট্রিম স্পেস-কালের বক্রতার একটি নির্দিষ্ট সীমারেখা অতিক্রম করলে যেকোনো বস্তু, এমনকি আলো অদৃশ্য হয়ে যায়, সময় স্থির হয়ে যায়। অর্থাৎ, যেকোনো ভরের বস্তুকে যদি যথেষ্ট ক্ষুদ্র স্পেসে কম্প্রেস করা যায়, তবে সেখানে এমন কিছু একটা তৈরি হবে, যাকে আমরা বর্তমানে ব্ল্যাক হোল বলি। এবং যেই সীমারেখা অতিক্রম করলে কোনো বস্তু আর ফিরে আসবে না, তাকে আমরা ইভেন্ট হরাইজন (Event Horizon) বলি।
এখানে মজার বিষয় হচ্ছে, যার থিওরি ব্ল্যাক হোলের মতো কিছু একটা প্রেডিক্ট করছিল, সেই আলবার্ট আইনস্টাইন নিজে বিশ্বাস করতে পারেননি যে বাস্তবে এমন কিছু থাকতে পারে।
২. ব্ল্যাক হোল কিভাবে তৈরি হয়?
আমরা সবাই জানি, যেকোনো তারার ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তারার ভরের উপর। আমাদের সূর্য ভবিষ্যতে হোয়াইট ডোয়ার্ফে (White Dwarf) পরিণত হবে। আমাদের সূর্যের চেয়ে বেশি ভরের তারা ভবিষ্যতে নিউট্রন স্টারে (Neutron Star) পরিণত হবে। এবং আমাদের সূর্যের চেয়ে মিনিমাম দশগুণ ভরের তারা তাদের লাইফসাইকেলের শেষে ব্ল্যাকহোলে পরিণত হয়।
যেকোনো তারার শক্তির উৎস হচ্ছে নিউক্লিয়ার ফিউশন (Nuclear Fusion)। নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট শক্তির কারণে তারার আউটার লেয়ারের প্রসারণ ঘটে। কিন্তু আবার গ্র্যাভিটির কারণে সেই প্রসারণ প্রশমিত হয়। ফলে স্টার একটি স্টেবল অবস্থায় থাকে। এইভাবে একসময় জ্বালানি ফুরিয়ে যায়। তখন গ্র্যাভিটির বিপরীতে কাজ করার জন্য তারার আর কোনো শক্তি অবশিষ্ট থাকে না। ফলে খুবই পাওয়ারফুল গ্র্যাভিটি সম্পূর্ণ তারাকে তার কেন্দ্রের দিকে সংকুচিত করতে থাকে। বিশাল তারাটি যখন কেন্দ্র বরাবর সংকুচিত হয়, তখন একটি পর্যায়ে ঘটে বিশাল বিস্ফোরণ, ফলে তারার আউটার লেয়ারের ম্যাটার চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, যাকে বলে সুপারনোভা (Supernova)। এখন তারার ভর যত বেশি হবে, গ্র্যাভিটি তত শক্তিশালী হবে। ফলে তারার ভর যদি যথেষ্ট হয়, তবে গ্র্যাভিটি এতটাই শক্তিশালী হবে যে, অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়বে। ফলে তারার কেন্দ্রের সম্পূর্ণ ভর একটি ইনফিনিটলি স্মল পয়েন্টে একইভূত হয়ে যায়। ফলাফল একটি নতুন ব্ল্যাক হোল।
৩. ব্ল্যাক হোলের অস্তিত্ব কিভাবে নিশ্চিত হলাম?
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ব্ল্যাক হোল যা দেখা যায় না, যা থেকে কোনো কিছু ফিরে আসে না, এমন বস্তুর অস্তিত্ব রয়েছে তা আমরা কিভাবে নিশ্চিত হলাম?
মনে করুন, মীরপুর স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে খুবই হাই ভোল্টেজ ক্রিকেট ম্যাচ চলছে। আপনি স্টেডিয়ামের বাইরে রয়েছেন। এখন আপনি স্টেডিয়ামের বাইরের দৃশ্য অর্থাৎ মানুষের ব্যস্ততা এবং কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সহজেই অনুমান করতে পারবেন যে, স্টেডিয়ামের ভেতরে অবশ্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি ম্যাচ চলছে। ঠিক তেমনই ব্ল্যাক হোল সরাসরি দেখা না গেলেও, ব্ল্যাক হোলের আশেপাশের পরিবেশ থেকে সহজেই ওই স্থানে যে ব্ল্যাক হোল রয়েছে, তা অনুমান করা যায়।
ইলেকট্রো ম্যাগনেটিক স্পেকট্রামের (Electromagnetic Spectrum) খুবই ছোট একটি অংশ, মাত্র ০.০০৩৫ শতাংশ আমরা খালি চোখে দেখতে পাই। এই ইলেকট্রো ম্যাগনেটিক স্পেকট্রামকে যদি আমরা পদ্মাসেতুর মতো দীর্ঘ মনে করি, তবে এই সেতুর মাত্র ২১ সেন্টিমিটার আমরা খালি চোখে দেখতে পাই। এই স্পেকট্রামের একদিকে রয়েছে রেডিও ওয়েভ, মাইক্রোওয়েভ, ইনফ্রারেড। এবং এইদিকে রয়েছে আলট্রাভায়োলেট, এক্স-রে, গামা-রে।
১৯৩১ সালের পর রেডিও ওয়েভ এবং এক্স-রে জ্যোতির্বিজ্ঞানে ডিপ স্পেস দেখার ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করে। কিন্তু তখনও ব্ল্যাক হোল সম্পর্কিত কোনো কিছুই লক্ষ্য করেননি। তবে তারা ডিপ স্পেসে অনেকগুলো উচ্চ শক্তি সম্পন্ন এক্স-রে উৎস দেখতে পান।
অবশেষে ১৯৭০ সালে পল মার্টিন (Paul Murdin) একটি অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করেন। আমরা আকাশে যত তারা দেখি, তাদের প্রায় অর্ধেক হচ্ছে বাইনারি স্টার (Binary Star)। দুইটি স্টার গ্র্যাভিটির কারণে যুক্ত থেকে ঘুরতে থাকলে তাদেরকে বাইনারি স্টার বলে। পল মার্টিন দেখতে পান আকাশের একটি নির্দিষ্ট দিকে বাইনারি স্টারের মধ্যে একটি মাত্র তারা দেখা যাচ্ছে। অন্য তারাটি দেখা যাচ্ছে না। অন্য তারাটির স্থান থেকে শুধু এক্স-রে নির্গত হচ্ছে। তখন পল মার্টিন এই ইনভিজিবল বস্তু, যা থেকে এক্স-রে নির্গত হচ্ছে, তার ভর নির্ণয় করার ক্ষেত্রে একটি খসড়া হিসেব করেন। যদি এই অদৃশ্য বস্তুর ভর সূর্যের ভরের তিনগুণ হয়, তবে ওই বস্তুটি অবশ্যই ব্ল্যাক হোল।
পল মার্টিন খসড়া হিসেব করে দেখেন, ওই অদৃশ্য বস্তুর ভর সূর্যের ভরের প্রায় পাঁচ থেকে ছয় গুণ। তখন তিনি এই বিষয়টি নিয়ে একটি পেপার পাবলিশ করেন এবং দাবি করেন, এটি সম্ভবত একটি ব্ল্যাক হোল। কিন্তু তখনও বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত ছিলেন না যে, পল মার্টিন যেটাকে ব্ল্যাক হোল বলছেন, তা আসলেই ব্ল্যাক হোল কিনা।
বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য পরবর্তী আরও বিশ বছরের মতো সময় লাগে। কারণ ওই ইনভিজিবল বস্তুর সঠিক ভর নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজন সঠিকভাবে দূরত্ব নির্ণয় করা। যেকোনো মহাজাগতিক বস্তুর দূরত্ব জানা থাকলে ১৬০০ বছর আগে জোহান কেপলারের (Johannes Kepler) দেওয়া সূত্র ব্যবহার করে সঠিকভাবে ভর নির্ণয় করা সম্ভব।
অবশেষে ১৯৯০ সালে প্যারালাক্স পদ্ধতি (Parallax Method) ব্যবহার করে ওই ইনভিজিবল বস্তুর দূরত্ব পাওয়া যায় ৬০০০ আলোকবর্ষ। এবং তা থেকে হিসাব করে দেখা যায়, ওই অদৃশ্য বস্তুর ভর সূর্যের ভরের প্রায় ১৫ গুণ। অবশেষে সবাই নিশ্চিত হন, ওই অদৃশ্য বস্তুটি একটি ব্ল্যাক হোল। এবং এটিই হচ্ছে মানুষের ডিটেক্ট করা প্রথম ব্ল্যাক হোল, যার নাম সিগনেস এক্স-ওয়ান (Cygnus X-1)।
তবে ২০২১ সালের সিগনেস এক্স-ওয়ানের দূরত্ব আরও সূক্ষ্মভাবে পরিমাপ করে প্রকাশ করা হয়। ২০২১ সালের তথ্যমতে, সূর্য থেকে সিগনেস এক্স-ওয়ানের দূরত্ব ৬০৭০ আলোকবর্ষ। ভর প্রায় ২১ সোলার ম্যাস। এবং এই ব্ল্যাক হোলের ইভেন্ট হরাইজনের ব্যাসার্ধ প্রায় ৪৬ কিলোমিটার।
এখন এই সিগনেস এক্স-ওয়ানকে কাছ থেকে দেখলে দেখা যাবে, এর চারদিকে রয়েছে একটি অ্যাক্রিশন ডিস্ক (Accretion Disk)। এই অ্যাক্রিশন ডিস্ক আসলে প্রচন্ড উত্তপ্ত গ্যাস এবং ডাস্ট, যা ব্ল্যাক হোলের ইভেন্ট হরাইজনের চারিদিকে অবস্থান করে। ব্ল্যাকহোলের চিত্র দেখলে মনে হয় এই অ্যাক্রিশন ডিস্ক ব্ল্যাকহোলে হয়তো বা দুইটি রয়েছে। একটি হচ্ছে এদিকে এবং অন্যটি হচ্ছে উপরের দিকে। কিন্তু বিষয়টি তা নয়। এই অ্যাক্রিশন ডিস্ক মূলত একটি। আমরা উপর দিকে যেটি দেখতে পাই, এটি ঘটে মূলত গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের (Gravitational Lensing) কারণে।
যাই হোক, ব্ল্যাক হোল যখন এই অ্যাক্রিশন ডিস্কের গ্যাস এবং ডাস্ট গ্রাস করতে থাকে, তখন অ্যাক্রিশন ডিস্কের গ্যাস এবং ডাস্ট উচ্চগতিতে ইভেন্ট হরাইজনের চারিদিকে ঘুরতে থাকে। অনেকটা পানি যখন কোনো ছিদ্র দিয়ে বের হবার ফলে উপরে যেমন একটি ঘূর্ণনের সৃষ্টি হয়, ঠিক তেমন।
যাইহোক, অ্যাক্রিশন ডিস্কে থাকা গ্যাস এবং ডাস্ট প্রায় আলোর বেগের ৫০ শতাংশ বেগে ঘুরতে থাকে। ফলে এদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়, যার ফলে এদের তাপমাত্রা প্রায় মিলিয়ন ডিগ্রি পর্যন্ত উঠে যায়। ফলে সেখান থেকে উচ্চ শক্তি সম্পন্ন এক্স-রে নির্গত হয়। এবং এই নির্গত হওয়া এক্স-রে মূলত পল মার্টিন এক্স-রে টেলিস্কোপের মাধ্যমে দেখতে পেয়েছিলেন।
এবং এই সিগনেস এক্স-ওয়ানের ক্ষেত্রে আরেকটি চমৎকার বিষয় হচ্ছে, পল মার্টিন বাইনারি স্টারের মধ্যে যেই তারাটিকে দেখেছিলেন অর্থাৎ যেটি দৃশ্যমান ছিল, সেই তারাটিকে এই সিগনেস এক্স-ওয়ান ব্ল্যাক হোল ক্রমাগত গ্রাস করছে। এইভাবে একসময় সিগনেস এক্স-ওয়ান তার বাইনারি স্টারটিকে সম্পূর্ণ গ্রাস করবে।
৪. সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল (Supermassive Black Hole)
সিগনেস এক্স-ওয়ানের পর একে একে অনেক ব্ল্যাক হোল ডিটেক্ট করা সম্ভব হয়েছে। এবং বিজ্ঞানীদের ধারণা, শুধুমাত্র আমাদের মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সিতেই এক থেকে দশ কোটি ব্ল্যাক হোল থাকতে পারে।
যাইহোক, সিগনেস এক্স-ওয়ান ডিটেক্ট করার পরে আরও একটি বিশাল সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছিল বিজ্ঞানীদের জন্য। রেডিও টেলিস্কোপ আবিষ্কার হবার পর বিজ্ঞানীরা ডিপ স্পেসে কিছু রহস্যময় হটস্পট দেখতে পান। এই হটস্পটগুলো দেখতে অনেকটা তারার মতো ছিল। এইসব হটস্পটগুলো যেহেতু বিজ্ঞানীরা রেডিও সিগনালের মাধ্যমে দেখতে পেয়েছেন, ফলে এদের নাম দেওয়া হয় কোয়াসার (Quasars), যা 'কোয়াসি-স্টেলার রেডিও সোর্সেস'-এর সংক্ষিপ্ত রূপ।
বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত ছিলেন না এইসব কোয়াসারগুলো আসলে তারা নাকি অন্য কিছু। ফলে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এইসব হটস্পট থেকে আসা ইলেকট্রো ম্যাগনেটিক স্পেকট্রাম অ্যানালিসিস করেন। কিন্তু এইসব হটস্পট থেকে আসা ইলেকট্রো ম্যাগনেটিক স্পেকট্রাম বিজ্ঞানীদের কাছে বোধগম্য হচ্ছিল না। যাই হোক, পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন এই ইলেকট্রো ম্যাগনেটিক স্পেকট্রাম আসলে হাইড্রোজেন নির্দেশ করছে। কিন্তু হাইড্রোজেনের স্পেকট্রাম বিশাল পরিমাণে লোয়ার ফ্রিকোয়েন্সিতে শিফট হয়ে যাচ্ছে। এর মানে দাঁড়ায়, কোয়াসারগুলো ক্রমাগত বিশাল গতিতে পরস্পর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা তখন অবাক হয়ে যান, ক্রমাগত দূরে সরে যাওয়া বস্তু কিভাবে এত উজ্জ্বল দেখাচ্ছে! ২০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে থাকা কোয়াসার প্রায় ১ লক্ষ কোটি সূর্যের সমান শক্তি প্রতি সেকেন্ডে নির্গত করছে। কিন্তু কিভাবে সম্ভব এতো বিপুল শক্তি তৈরি করা? বিজ্ঞানীরা কোনোভাবেই এতো বিপুল শক্তির সমীকরণ মেলাতে পারছিলেন না। কেমিক্যাল এনার্জি বা নিউক্লিয়ার এনার্জি কোনোভাবে এতো বিপুল শক্তির উৎস হওয়া সম্ভব নয়। তাহলে এত শক্তি আসছে কোথা থেকে? এর উত্তর একটাই, এবং তা হচ্ছে গ্র্যাভিটি বা মহাকর্ষ।
প্রতিদিনকার জীবনে আমরা গ্র্যাভিটিকে খুবই দুর্বল শক্তি হিসেবে জেনেছি বা অনুভব করি। কিন্তু আপনি যদি বিশাল ভরকে ইনফিনিটলি স্মল পয়েন্টে একইভূত করেন, তবে সেখানে গ্র্যাভিটির শক্তি হবে অকল্পনীয়। বিজ্ঞানীরা তখন নিশ্চিত হন, এইসব হটস্পট আসলে এক একটি বিশাল বিশাল ব্ল্যাক হোল। এবং এই সকল বিশাল বিশাল ব্ল্যাক হোলের চারপাশে ঘূর্ণায়মান অ্যাক্রিশন ডিস্ক থেকে এতো বিশাল উজ্জ্বলতা তৈরি হচ্ছিল।
কোয়াসারের কেন্দ্রে থাকা এই সকল ব্ল্যাক হোল আসলে এক একটি সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল (Supermassive Black Hole), যাদের ভর সূর্যের ভরের লক্ষ থেকে কোটি গুণ। সিগনেস এক্স-ওয়ানের ভর সূর্যের ভরের মাত্র ২১ গুণ, কিন্তু কোয়াসারে থাকা সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল সূর্যের ভরের লক্ষ থেকে কোটি গুণ। এবং এই সকল সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলগুলো মূলত এক একটি গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অবস্থান করছে।
তখন একটি প্রশ্ন সামনে আসে: আমাদের মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সির (Milky Way Galaxy) কেন্দ্রে কি একটি সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল রয়েছে? যদি থেকে থাকে, আমরা সেটা কিভাবে বুঝতে পারব? অন্য গ্যালাক্সির কেন্দ্র সম্পর্কে স্টাডি করা সহজ। কিন্তু মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সির ভেতরে থেকে এর কেন্দ্র সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য যাচাই করা খুবই কঠিন। কারণ আমাদের মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সির ব্যাস ১ লক্ষ আলোকবর্ষ। কিন্তু এর থিকনেস মাত্র ১০০০ আলোকবর্ষ। পৃথিবী থেকে মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রের দূরত্ব ২৬ হাজার আলোকবর্ষ। এখন পৃথিবী মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রের মধ্যবর্তী স্থানে রয়েছে লক্ষ লক্ষ তারা, ডাস্ট, গ্যাস ইত্যাদি। ফলে মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রের আলো পৃথিবীতে আসার পথে নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হবে, যার ফলে গ্যালাক্সির কেন্দ্রের শার্প ইমেজ ক্যাপচার করা প্রায় অসম্ভব।
১৯৯০ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে আসলেই কোনো সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল রয়েছে কিনা তা জানার জন্য একটি প্রজেক্ট হাতে নেন। কিন্তু তখন আগের সমস্যার সাথে নতুন আর একটি সমস্যা যুক্ত হয়, তা হচ্ছে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের কারণে স্পেসের যেকোনো ইমেজ ওয়েভি (Wavy) হয়ে যায়, যা দেখলে ঢেউ ঢেউ মনে হয়। এবং এই সমস্যার সমাধান করার জন্য তারা টেলিস্কোপ থেকে একটি লেজার (Laser) আকাশে নিক্ষেপ করেন, যা গাইড স্টার (Guide Star) হিসেবে কাজ করে। এর সাপেক্ষে অন্য তারাগুলো কতটা শিফট হচ্ছে, তা কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের মাধ্যমে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের সমস্যার সমাধান করা হয়। এবং মিল্কি ওয়ে কেন্দ্রের থেকে আসা আলোর শার্পনেস বৃদ্ধি করার জন্য টেলিস্কোপের ভেতরে একটি মিরর সেট করেন, যা সেকেন্ডে প্রায় ২০০০ বার শেপ চেঞ্জ করতে পারে। এবং এইভাবে তারা মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রের শার্প ইমেজ ক্যাপচার করতে সক্ষম হন।
তখন তারা কয়েক বছর যাবত মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রের আশেপাশে যে সকল তারা রয়েছে, তাদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন। তারা দেখতে পান, যখনই কোনো তারা মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রের কাছাকাছি আসে, তখন তারার গতি অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে যায়। তারার গতির এমন অস্বাভাবিকতা একটিই মানে দাঁড়ায় - তারাগুলো অবশ্যই কোনো এক্সট্রিম ভরের বস্তুর আশেপাশে ঘুরছে। এবং সেই ভর সূর্যের ভরের ৪০ লক্ষ গুণ। সুতরাং এটি নিশ্চিত, আমাদের মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে রয়েছে একটি সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল, যার ভর আমাদের সূর্যের ভরের ৪০ লক্ষ গুণ। এবং ওই ব্ল্যাক হোলের ইভেন্ট হরাইজনের ব্যাসার্ধ হচ্ছে আমাদের সূর্যের ব্যাসার্ধের প্রায় ১৭ গুণ বা ১৩০ লক্ষ কিলোমিটার। তাহলে বুঝতেই পারছেন, এই ব্ল্যাক হোলটি কতটা বিশাল। এবং এই ব্ল্যাক হোলের নাম দেওয়া হয় *স্যাজিটেরিয়াস এ স্টার (Sagittarius A)**।
মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সির সবচেয়ে কাছের গ্যালাক্সি অ্যান্ড্রোমিডা (Andromeda), যা ২৫ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। অ্যান্ড্রোমিডার কেন্দ্রে অবস্থিত সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলের ভর প্রায় ৮ থেকে ১০ কোটি সোলার ম্যাস। এবং ওই ব্ল্যাক হোলটিকে যদি আমাদের সোলার সিস্টেমের কেন্দ্রে বসানো হয়, তবে বুধ, শুক্র, পৃথিবী এবং মঙ্গল গ্রহ ব্ল্যাক হোলের ইভেন্ট হরাইজনের ভেতরে চলে যাবে। এতটাই বিশাল! এবং মহাজগতে এর চেয়েও বড় সূর্যের ভরের ১০০ থেকে ২০০ কোটি গুণ ভরের ব্ল্যাক হোলও রয়েছে।
সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল কিভাবে তৈরি হয়?
এখন প্রশ্ন, এত বিশাল বিশাল সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল কিভাবে তৈরি হয়? কারণ মহাজগতে এতো বিশাল বিশাল ভরের তারা নেই, যা থেকে সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল তৈরি হতে পারে।
তাহলে এত সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল তৈরি হলো কিভাবে? এর একটি উত্তর হতে পারে, ব্ল্যাক হোল তার আশেপাশের তারাকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে বড় হয়। প্রথমে দেখানো সিগনেস এক্স-ওয়ানের মতো। কিন্তু এই পদ্ধতিতে ব্ল্যাক হোল সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলে পরিণত হতে অনেক দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। সুতরাং এই পদ্ধতিতে সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল তৈরি হয়নি।
পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেন, কোনো আনলকড স্টার (Unlocked Star) যদি তার গতিপথের কোনো এক সময় ব্ল্যাক হোলের আশেপাশে চলে আসে, তবে ব্ল্যাক হোল সম্পূর্ণ তারাকে তুলনামূলক দ্রুত গতিতে গ্রাস করতে সক্ষম। এখন ব্ল্যাক হোল ধীরে ধীরে বা দ্রুত গতিতে যেভাবে পার্টিক্যাল গ্রাস করুক না কেন, তাতে এত এত বিশাল সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল তৈরি হওয়া সম্ভব নয়। কারণ এখানে মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় সময়। পার্টিক্যাল গ্রাস করে এত সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল তৈরি হতে যেই সময়ের প্রয়োজন, হিসেব করে দেখা গেছে তা বিগ ব্যাংয়ের চেয়েও বেশি সময়। সুতরাং পার্টিক্যাল গ্রাস করে কখনোই সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল তৈরি হয়নি। কারণ অ্যাডিংটন লিমিট (Eddington Limit) অনুযায়ী, ব্ল্যাক হোল কখনোই খুবই দ্রুত গতিতে কোনো কিছু গ্রাস করতে পারে না।
ব্ল্যাক হোল প্রচুর পরিমাণ গ্যাস এবং রেডিয়েশন জেটসের মাধ্যমে বহুদূরে প্রায় আলোর গতিতে ছুঁড়ে থাকে। এবং এই জেটস থেকে নির্গত রেডিয়েশনের প্রেসারের কারণে আশেপাশের গ্যাস এবং পার্টিক্যাল দূরে সরে যায়। সুতরাং, ব্ল্যাক হোল কোনো একটি বস্তুকে কত দ্রুত গতিতে গ্রাস করতে পারবে তার একটি লিমিট রয়েছে। এবং সেই লিমিটকে বলা হয় অ্যাডিংটন লিমিট।
এই ক্ষেত্রে অনেকে মনে করেন, সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলগুলো জন্মের সময়ই বিশাল আকার নিয়ে জন্ম নিয়েছে। এবং এটি সম্ভব হয়েছে ডিরেক্ট কলাপসের (Direct Collapse) মাধ্যমে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, সরাসরি গ্যাস এবং ডাস্ট টর্নেডোর মতোই ঘুরতে ঘুরতে সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল তৈরি করেছে। এখানে গ্যাস থেকে তারা সৃষ্টি হওয়ার পর্বটি ঘটেনি। ফলে এটিকে ডিরেক্ট কলাপস বলা হয়। তবে এটি শুধুমাত্র একটি ধারণা।
৫. মহাবিশ্বকে শোনা: গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ
যাইহোক, মানব ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপ জেমস ওয়েব (James Webb) এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে, যা ইনফ্রারেড রশ্মি ডিটেক্ট করতে পারবে। এর মাধ্যমে হয়তো বা নতুন অনেক কিছু জানা সম্ভব। তবে শুধু যে দেখার মাধ্যমে মহাবিশ্বকে জানা যায় তা কিন্তু নয়। আমরা মহাবিশ্বকে শুনতেও পারি। এবং মহাবিশ্বকে শুনতে হলে আপনাকে যেতে হবে ইউনাইটেড স্টেটে অবস্থিত লাইগো (LIGO) পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে। সেখানে গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ (Gravitational Wave) অবজার্ভ করা হয়। আইনস্টাইনের জেনারেল রিলেটিভিটি অনুযায়ী, কোনো বস্তু যখন মুভ করে, তখন বস্তুটি তার আশেপাশের স্পেস-টাইমের রিপল (Ripple) তৈরি করে। অর্থাৎ, স্পেস-টাইমের সংকোচন এবং প্রসারণ ঘটে, অনেকটা ঢেউয়ের মতো। এবং একইভাবে দুইটি বস্তু যখন একসাথে মিলিত হয়, স্পেস-টাইমের এমন সংকোচন এবং প্রসারণ ঘটে।
এখন মানুষ যদি এই গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ ডিটেক্ট করতে পারে, তবে তা থেকে সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যাবে। কিন্তু কিভাবে পৃথিবীতে থেকে গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ শনাক্ত করা যাবে?
গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ ডিটেক্ট করার ক্ষেত্রে লাইগো তাদের পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে ব্যবহার করেছে আলো। একটি আলোক উৎস থেকে আলোকে দুইটি ভিন্ন স্থানে প্রেরণ করা হয়। এবং আলো ওই দুটি ভিন্ন উৎস থেকে প্রতিফলিত হয়ে একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে মিলিত হয়ে একটি ডিটেক্টরে পতিত হয়। এখন দুইটি ভিন্ন স্থানের দূরত্ব যদি কম বেশি না হয়, তবে ডিটেক্টরে কিছুই দেখা যাবে না। অর্থাৎ, দুইটি ভিন্ন স্থান থেকে আসা আলো একটি আরেকটিকে ক্যান্সেল করে দেবে। আর যদি দুইটি ভিন্ন স্থানের দূরত্বের মধ্যে এদিক সেদিক হয়, তাহলে ডিটেক্টরে আলো পাওয়া যাবে। এখন কোনো কারণে গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ যদি এই স্থানটি দিয়ে অতিক্রম করে, তবে দুইটি ভিন্ন স্থানের মধ্যবর্তী দূরত্ব কম বেশি হবে। ফলে ডিটেক্টরে আলো পাওয়া যাবে। এবং এই আইডিয়া অনুযায়ী ইউনাইটেড স্টেটের দুইটি স্থানে প্রয়োজনীয় ইন্সট্রুমেন্ট সেটআপ করা হয়। এবং ইন্সট্রুমেন্ট করার ক্ষেত্রে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করা হয়, যেন কোনো প্রকার নয়েজ ফলাফলকে প্রভাবিত না করতে পারে। দুইটি সেটআপ বসানোর কারণ হচ্ছে প্রাপ্ত ফলাফল আসলেই গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ কিনা তা যাচাই করার জন্য। যদি দুইটি স্থানেই আলোর যাত্রা পথে ডিস্টার্বেন্স তৈরি হয়, তবে নিশ্চিত ভাবে বলা যাবে তা গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ। আর যদি দুইটি স্থানে একসাথে ডিস্টার্বেন্স না ঘটে, তবে বুঝতে হবে এখানে নয়েজ বা অন্য কিছু ঘটেছে।
অবশেষে বিজ্ঞানীরা ২০১৫ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর একটি সিগনাল দেখতে পান। এই হচ্ছে সেই সিগনাল। যা আইনস্টাইনের প্রেডিক্ট করা গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভের বাস্তব প্রমাণ। এই সিগনাল পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারে যেই সংঘর্ষের কারণে এই গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ তৈরি হয়েছে, সেই সংঘর্ষটি সংঘটিত হয়েছে প্রায় ১৩ কোটি বছর আগে। এবং যেই দুটি বস্তুর মধ্যে সংঘর্ষ ঘটেছিল, তা হচ্ছে দুইটি ব্ল্যাক হোল। একটির ভর ছিল ২৯ সোলার ম্যাস এবং অন্যটির ভর ছিল ৩৬ সোলার ম্যাস। এই দুটি ব্ল্যাক হোল একসাথে হয়ে একটি বড় সিঙ্গেল ব্ল্যাক হোলে পরিণত হয়। এবং এই অবজারভেশন থেকে বিজ্ঞানীরা একটি বিষয় বুঝতে পারেন, ব্ল্যাক হোল যে শুধু পার্টিক্যাল গ্রাস করে তা নয়, ব্ল্যাক হোল ব্ল্যাক হোলকে গ্রাস করতে পারে। এবং এরকম ঘটনার পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে হয়তো বা সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল তৈরি হয়েছে। লাইগো তাদের এই ঐতিহাসিক কাজের জন্য ২০১৭ সালের নোবেল পুরস্কার পায়।
৬. পৃথিবীতে ব্ল্যাক হোল তৈরি করা সম্ভব?
এখন একটি চমকপ্রদ তথ্য দেই: পৃথিবীতে ব্ল্যাক হোল তৈরি করা সম্ভব! বিজ্ঞানীরা অন্তত সেটাই মনে করেন। দুইটি সাব-অ্যাটোমিক পার্টিকেলকে যদি খুবই উচ্চগতিতে প্রায় আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে সংঘর্ষ ঘটানো সম্ভব হয়, তবে খুবই ক্ষুদ্র একটি ব্ল্যাক হোল তৈরি হবে এবং সেই ব্ল্যাক হোল খুবই অল্প সময়ের জন্য হবে। ইউরোপে অবস্থিত সার্ন (CERN) তাদের লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার (Large Hadron Collider - LHC) এর মধ্যে টাইনি ব্ল্যাক হোল ক্রিয়েট করার চেষ্টা করছে। সমস্যা হচ্ছে, ব্ল্যাক হোল তৈরি করার জন্য সাব-অ্যাটোমিক পার্টিক্যালকে যতটা গতি প্রদান করতে হবে, তা এখনো অ্যাচিভ করা সম্ভব হয়নি। তবে ভবিষ্যতে হয়তো বা সেই গতি অ্যাচিভ করা সম্ভব হবে। এবং তা যদি সম্ভব হয়, তখন ব্ল্যাক হোল সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা সম্ভব হবে।
৭. ব্ল্যাক হোলের ভবিষ্যৎ
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: ব্ল্যাক হোলের ভবিষ্যৎ কী? এই প্রশ্নের উত্তর দুইটি ভিন্ন দিক থেকে বলা যেতে পারে।
প্রথমত, স্টিফেন হকিং বলেছেন, ব্ল্যাক হোল থেকে এক ধরনের রেডিয়েশন নির্গত হয়, যার নাম হকিং রেডিয়েশন (Hawking Radiation)। এখন স্টিফেন হকিং যদি সঠিক হন, তবে ব্ল্যাক হোল রেডিয়েশন নির্গত করতে করতে নিঃশেষ হয়ে যাবে। যদিও এখনো পর্যন্ত হকিং রেডিয়েশনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
দ্বিতীয়ত, যদি হকিং রেডিয়েশন বলতে কিছু না থাকে, তবে মহাজগতের সকল বস্তুকে ব্ল্যাক হোল গ্রাস করে একটি সুপার-সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলে পরিণত হবে। এবং এর সাথে সাথে আমাদের এই বাস্তবতার অবসান ঘটবে।
এখন ব্ল্যাক হোলের একদম কেন্দ্রে যাকে সিঙ্গুলারিটি বলা হয়, সেখানে আসলে কী আছে, তা আমরা জানি না। ফলে এমনও হতে পারে, সেখান থেকে নতুন কোনো বাস্তবতার সূচনা হতে পারে। পরমাণুতে ইলেকট্রন কখনোই নিউক্লিয়াসের চারদিকে ঘোরে না। আমাদের পরিচিত এই চিত্র আসলে ভুল। কেন এই চিত্র ভুল, তা জানতে এই পোস্টটি পড়তে পারেন। পোস্টটি ভালো লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে দিন।
উপসংহার
সর্বশেষে, থ্যাঙ্কস ফর রিডিং, স্টে হ্যাপি, স্টে কুল।
কীওয়ার্ডস: ব্ল্যাক হোল, কৃষ্ণ গহ্বর, মহাজাগতিক রহস্য, আইনস্টাইন, জেনারেল রিলেটিভিটি, কার্ল শর্টশিল্ড, ইভেন্ট হরাইজন, সুপারনোভা, সিগনেস এক্স-ওয়ান, অ্যাক্রিশন ডিস্ক, সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল, কোয়াসার, স্যাজিটেরিয়াস এ স্টার, মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সি, অ্যান্ড্রোমিডা, ডিরেক্ট কলাপস, অ্যাডিংটন লিমিট, গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ, লাইগো, হকিং রেডিয়েশন, সার্ন, লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার, মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ, জ্যোতির্বিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা।
আপনার অনুরোধটি স্বীকার করা হয়েছে। "ব্ল্যাক হোল: মহাজগতের সবচেয়ে অদ্ভুত, রহস্যময় ও শক্তিশালী জিনিস!" Canvas-এর নির্বাচিত অংশ থেকে কিছু প্রশ্ন ও উত্তর নিচে দেওয়া হলো:
প্রশ্ন ১: ব্ল্যাক হোল আসলে কী?
উত্তর: ব্ল্যাক হোল হচ্ছে একটি গোলক আকৃতির স্পেস বা স্থান। সেখানে কোনো কিছু নেই, সম্পূর্ণ শূন্যস্থান, তবে ব্ল্যাকহোলে রয়েছে খুবই শক্তিশালী গ্রাভিটি।
প্রশ্ন ২: ইভেন্ট হরাইজন কী?
উত্তর: ইভেন্ট হরাইজন হলো সেই সীমারেখা, যা অতিক্রম করলে কোনো বস্তু, এমনকি আলোও আর ব্ল্যাক হোল থেকে ফিরে আসতে পারে না।
প্রশ্ন ৩: আলবার্ট আইনস্টাইন ব্ল্যাক হোলের অস্তিত্ব সম্পর্কে কী মনে করতেন?
উত্তর: আলবার্ট আইনস্টাইন কখনোই মেনে নিতে পারেননি যে ব্ল্যাক হোলের মতো জিনিস বাস্তবে এক্সিস্ট করতে পারে, যদিও তাঁর থিওরিই ব্ল্যাক হোলের মতো কিছু একটা প্রেডিক্ট করছিল।
প্রশ্ন ৪: একটি তারা ব্ল্যাক হোলে পরিণত হতে হলে তার ভরের কী শর্ত থাকতে হবে?
উত্তর: আমাদের সূর্যের চেয়ে মিনিমাম দশগুণ ভরের তারা তাদের লাইফসাইকেলের শেষে ব্ল্যাকহোলে পরিণত হয়।
প্রশ্ন ৫: সুপারনোভা কী?
উত্তর: যখন বিশাল একটি তারা তার জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার পর কেন্দ্রের দিকে সংকুচিত হয় এবং একটি বিশাল বিস্ফোরণ ঘটে, ফলে তারার আউটার লেয়ারের ম্যাটার চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তাকে সুপারনোভা বলে।
