জৈন দর্শন: স্যাদবাদ ও সপ্তভঙ্গিনয় - জ্ঞানের আপেক্ষিকতা ও বহুত্ববাদ
নয় (Naya) কী? জ্ঞানের আংশিক দৃষ্টিভঙ্গি
জৈনমতে, প্রতিটি বস্তুর অগণিত গুণ বা ধর্ম রয়েছে। আমাদের সীমিত জ্ঞান দিয়ে আমরা একটি বস্তুর সব গুণ একবারে জানতে পারি না। কেবল সর্বজ্ঞ পুরুষ তাঁর কেবলজ্ঞানের (absolute knowledge) মাধ্যমে বস্তুর অসংখ্য গুণকে জানতে পারেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ একটি নির্দিষ্ট সময়ে, একটি বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে বস্তুকে দেখে। এই কারণে তারা বস্তুর একটি নির্দিষ্ট ধর্মকেই জানতে পারে। বস্তুর অনন্ত ধর্মের মধ্যে এরূপ একটি বিশিষ্ট ধর্মের জ্ঞানকে 'নয়' বলা হয়। তাই জৈনমতে 'নয়'কে আংশিক জ্ঞানও বলা হয়ে থাকে। তবে যে দৃষ্টিকোণ থেকে এই জ্ঞান লাভ করা হয়, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এটি যথার্থ, কিন্তু বস্তুর সামগ্রিক জ্ঞান হিসেবে নয়। জ্ঞানের এই আপেক্ষিকতা সম্পর্কে আমরা সচেতন না থাকলেই আমাদের মধ্যে মতবিরোধ ও কলহ দেখা দেয়।
অন্ধ ও হাতির দৃষ্টান্ত: জ্ঞানের এই আপেক্ষিকতাকে বোঝানোর জন্য জৈনগণ একটি বিখ্যাত দৃষ্টান্ত ব্যবহার করেন: কয়েকজন অন্ধ ব্যক্তি একটি হাতির বিভিন্ন অঙ্গ স্পর্শ করে ভিন্ন ভিন্ন জ্ঞান লাভ করে। যে হাতির পা স্পর্শ করে, তার কাছে হাতি স্তম্ভের মতো; যে কান স্পর্শ করে, তার কাছে হাতি কুলোর মতো; যে দেহ স্পর্শ করে, তার কাছে হাতি পাহাড়ের মতো; এবং যে শুঁড় স্পর্শ করে, তার কাছে হাতি লতার মতো। আপাতদৃষ্টিতে তাদের এই ধারণাগুলি পরস্পরবিরোধী মনে হলেও, বস্তুতপক্ষে এগুলি হাতির আংশিক এবং আপেক্ষিক সত্য প্রকাশ করে। যখন অন্ধ ব্যক্তিরা তাদের জ্ঞানের আপেক্ষিকতা উপলব্ধি করবে, তখন তারা প্রকৃত সত্যকে জানতে পারবে এবং তাদের মধ্যেকার বিরোধ দূর হবে। এই ধরনের জ্ঞান প্রকাশক অবধারণ বা পরামর্শকেও 'নয়' বলা হয়।
স্যাদবাদ (Syadvada): প্রতিটি উক্তিই আপেক্ষিক
যৌক্তিক দিক থেকে জৈনগণ অবধারণের আপেক্ষিকতা বোঝানোর জন্য প্রতিটি অবধারণের পূর্বে আপেক্ষিকতা সূচক 'স্যাৎ' শব্দটি ব্যবহার করেন। জৈনদের তর্কশাস্ত্রের মূল কথা হলো স্যাদবাদ (relativity of knowledge)। স্যাদবাদের মূল কথা হলো: বস্তু বা সত্তার স্বরূপ বহুমুখী, তাই বিভিন্নভাবেই তা বর্ণিত হতে পারে। এর মধ্যে কোনো বর্ণনাই মিথ্যা নয়, আবার কোনো বর্ণনাই একমাত্র সত্য নয়। যেহেতু সত্তার বহুমুখী দিক বা স্বরূপ সম্বন্ধে সামগ্রিক উক্তি একমাত্র পূর্ণজ্ঞানীর পক্ষেই সম্ভব, তাই সাধারণ দৃষ্টিতে প্রত্যেক বিষয়ে আমাদের প্রতিটি উক্তিই শেষ পর্যন্ত সম্ভাবনামূলক। এই সম্ভাবনার নির্দেশক শব্দ হলো 'স্যাৎ'।
'স্যাৎ' শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ 'হয়তো' বা 'হতে পারে' হলেও, জৈন দার্শনিকগণ এটিকে নিছক সম্ভাবনা বা সংশয়ের অর্থে গ্রহণ করেননি। বরং এটি প্রকাশিত অবধারণ ভিন্ন অন্য অবধারণের সম্ভাবনা নির্দেশ করে। 'স্যাৎ' শব্দটি একটি অবধারণের আপেক্ষিকতাকে যেমন প্রকাশ করে, তেমনি অন্য অবধারণের সম্ভাবনাকেও প্রকাশ করে। তাই জৈন দর্শন সংশয়বাদী নয়। তাদের মতে, 'হাতি স্তম্ভের মতো হতে পারে' (স্যাৎ হস্তী স্তম্ভ ইব) - এই অবধারণটি একটি আপেক্ষিক সত্যকে প্রকাশ করে, যেখানে স্থান ও কালের পরিপ্রেক্ষিতে একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে হাতিকে স্তম্ভের মতো বলা হচ্ছে। জৈন দর্শনে 'স্যাৎ' শব্দ অবধারণের সাপেক্ষ-সদর্থক-রূপকে গ্রহণ করার এবং নিরপেক্ষরূপকে বর্জন করার পক্ষপাতী।
সপ্তভঙ্গিনয় (Saptabhanginaya): জ্ঞানের সাতটি ভঙ্গি
স্যাদবাদকে আরও সুস্পষ্টভাবে বোঝানোর জন্য জৈনাচার্যগণ সাতটি পরামর্শ বা বাক্য প্রয়োগ করেন। প্রতিটি বাক্যকে এক একটি 'ভঙ্গি' বলা হয়, এবং এই সাত প্রকার বাক্যকে একত্রে সপ্তভঙ্গিনয় বলা হয়। ভগবতীসূত্র অনুযায়ী স্বয়ং মহাবীর তিনটি মূল ভঙ্গি উল্লেখ করেছেন: 'স্যাৎ অস্তি' (সম্ভবত আছে), 'স্যাৎ নাস্তি' (সম্ভবত নেই), এবং 'স্যাৎ অব্যক্তব্যম্' (সম্ভবত অবক্তব্য)। এই ভঙ্গিত্রয়ের পারস্পরিক মিশ্রণেই সপ্তভঙ্গিনয়ের উদ্ভব হয়েছে।
সপ্তভঙ্গিনয়ের সাতটি ভঙ্গি হলো:
স্যাৎ অস্তি (সম্ভবত আছে): কোনো বিশেষ দেশ, কাল ও প্রসঙ্গে কোনো বস্তু আছে। এটি একটি ভাবাত্মক বাক্য।
উদাহরণ: 'হয়তো ফলটি সবুজ' বা 'একদিক থেকে ফলটি সবুজ'। এর অর্থ হলো, নির্দিষ্ট স্থানে ফলটি সবুজ হলেও, সবসময় ফলটি সবুজ নাও হতে পারে।
স্যাৎ নাস্তি (সম্ভবত নেই): কোনো উপাদান, স্থান, কাল ও অন্য বস্তুর স্বরূপে কোনো বস্তু বিদ্যমান নয়। এটি একটি অভাবাত্মক পরামর্শ।
উদাহরণ: 'হয়তো ফলটি সবুজ নয়'। এর অর্থ হলো, কোনো বিশেষ সময়ে বা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ফলটি সবুজ হলেও, সবসময় তা নাও থাকতে পারে।
স্যাৎ অস্তি চ নাস্তি চ (সম্ভবত আছেও নেইও): কোনো বস্তু একই সাথে বিদ্যমান ও অবিদ্যমান উভয়ই।
উদাহরণ: 'হয়তো ফলটি সবুজ এবং সবুজ নয়'। একটি ফল প্রথমে সবুজ থাকে, পরে পাকলে হলদে হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ একই সময়ে এটি সবুজ (আগে ছিল) এবং সবুজ নয় (এখন নয়)।
স্যাৎ অব্যক্তব্যম্ (সম্ভবত অবক্তব্য): বস্তুর স্বরূপ নির্দিষ্ট করা যায় না। যখন পরস্পর বিরোধী গুণ একই সাথে বিবেচনা করা হয়, তখন 'অবক্তব্য' শব্দ প্রয়োগ করা হয়।
উদাহরণ: ফলটি কখনো সবুজ, কখনো হলুদ। এক্ষেত্রে যদি প্রশ্ন করা হয়, সকল অবস্থায় ফলটির বর্ণ কী? উত্তর হবে 'অবক্তব্য'।
স্যাৎ অস্তি চ অব্যক্তব্যম্ চ (সম্ভবত আছেও অবক্তব্যও): বস্তুটি আছে, অথচ অনির্দিষ্ট হবে। প্রথম ও চতুর্থ ভঙ্গির মিশ্রণ।
উদাহরণ: 'হয়তো ফলটি সবুজ এবং অবক্তব্য'। ফলটি বিশেষ সময়ে সবুজ, কিন্তু সব অবস্থায় ফলটি কেমন তা বর্ণনা করা যায় না।
স্যাৎ নাস্তি চ অব্যক্তব্যম্ চ (সম্ভবত নেইও অবক্তব্যও): বস্তুটি নেই, অথচ তার রূপ নির্দিষ্ট করা যায় না। দ্বিতীয় ও চতুর্থ ভঙ্গির মিশ্রণ।
উদাহরণ: 'হয়তো ফলটি সবুজ নয় এবং অবক্তব্য'। ফলটি সময় বিশেষে সবুজ নয়, কিন্তু সব অবস্থায় ফলটি কেমন তা বর্ণনা করা যায় না।
স্যাৎ অস্তি চ নাস্তি চ অব্যক্তব্যম্ চ (সম্ভবত আছেও, নেইও, অবক্তব্যও): বস্তুটি আছে, নেই এবং অবক্তব্য। তৃতীয় ও চতুর্থ ভঙ্গির মিশ্রণ।
উদাহরণ: 'হয়তো ফলটি সবুজ এবং সবুজ নয় এবং অবক্তব্য'। ফলটি সময় বিশেষে সবুজ অথবা সময় বিশেষে সবুজ নয়, এবং সব অবস্থায় ফলটি কী তা বলা যায় না।
জৈনমতে, কোনো বস্তুর অনন্ত ধর্ম থাকলেও, তার বর্ণনা করতে হলে এই সাত প্রকার পরামর্শের মধ্যেই যেকোনো একটিকে ব্যবহার করতে হবে। পরামর্শের সংখ্যা সাতের বেশি কখনও হতে পারবে না।
স্যাদবাদের সমালোচনা
স্যাদবাদ ভারতীয় দর্শনে বহু সমালোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে:
বিরোধাত্মক সিদ্ধান্ত: বৌদ্ধ ও বেদান্তী দার্শনিকরা স্যাদবাদকে বিরোধাত্মক বলে অভিহিত করেছেন। রামানুজের মতে, সত্তা ও অসত্তাকে আলো ও অন্ধকারের মতো একত্রিত করা যায় না। শঙ্করাচার্য স্যাদবাদকে 'পাগলের প্রলাপ' বলে আখ্যায়িত করেছেন, কারণ যা অবক্তব্য, তা কিভাবে বলা যায়?
স্ব-খণ্ডন: বেদান্তী দার্শনিকদের মতে, যদি স্যাদবাদ অনুযায়ী সকল বস্তুই সম্ভবমাত্র হয়, তবে স্যাদবাদ স্বয়ংই সম্ভবমাত্র হয়ে যাবে, যা একটি অসঙ্গত সিদ্ধান্ত।
অপ্রয়োজনীয়তা ও বাহুল্য: মীমাংসা দার্শনিক কুমারিল ভট্ট মনে করেন, সপ্তভঙ্গিনয়ের শেষ তিনটি ভঙ্গি অপ্রয়োজনীয় ও বাহুল্যমাত্র, কারণ এগুলি কেবল প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় নয়ের সঙ্গে চতুর্থ নয়ের সংমিশ্রণ।
নিরপেক্ষ সত্তার অভাব: সমালোচকদের মতে, স্যাদবাদ কেবল সাপেক্ষকে স্বীকার করে, নিরপেক্ষ সত্তা স্বীকার করে না। নিরপেক্ষের অভাবে স্যাদবাদের সাতটি পরামর্শ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
কেবলজ্ঞানের সাথে অসঙ্গতি: জৈনগণ কেবলজ্ঞানে বিশ্বাস করেন, যা সত্য, বিরোধশূন্য ও সংশয়শূন্য। কিন্তু বিভিন্ন সাপেক্ষ সত্য যোগ করলে কিভাবে নিরপেক্ষ বা পূর্ণ সত্য পাওয়া যায়, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
উপসংহার
স্যাদবাদ এবং সপ্তভঙ্গিনয় জৈন দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে, যা জ্ঞানের আপেক্ষিকতা এবং বস্তুর বহুত্ববাদী স্বরূপকে তুলে ধরে। যদিও এই তত্ত্বগুলি বিভিন্ন দার্শনিক সম্প্রদায় থেকে সমালোচিত হয়েছে, তবুও ভারতীয় জ্ঞানতত্ত্ব ও তর্কশাস্ত্রে এদের অবদান অনস্বীকার্য। জৈনদের এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের শেখায় যে, সত্যকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা সম্ভব এবং প্রতিটি আংশিক সত্যের সমন্বয়েই পূর্ণ সত্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া যায়।
জৈন দর্শনের এই গভীর তত্ত্ব সম্পর্কে আপনার আর কোনো প্রশ্ন আছে কি?