চ্যাটজিপিটি কী, কীভাবে ব্যবহার করবেন?
![]() |
| ছবি ক্যানভা থেকে বানানো |
চ্যাটজিপিটি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপ্লব ও এর কার্যকারিতা!
বন্ধুরা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতির ফসল চ্যাটজিপিটি (ChatGPT)। এর পূর্ণরূপ হলো চ্যাট জেনারেটিভ প্রি-ট্রেইনড ট্রান্সফরমার (Chat Generative Pre-trained Transformer)। এটি মূলত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কোম্পানি ওপেনএআই (OpenAI) এর তৈরি করা একটি ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল। এই মডেল মানুষের মতো কথা বুঝতে এবং মানুষের মতো প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম। অতীতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্বলিত এরকম অনেক পণ্য তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু কোনটি চ্যাটজিপিটির মতো কার্যকরী ছিল না। আগের সকল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সাথে কথা বলার অভিজ্ঞতা ছিল অনেকটা রোবটের সাথে কথা বলার মতো। কিন্তু চ্যাটজিপিটির বিশেষত্বই হলো এটি মানুষের কথাবার্তা এমনভাবে নকল করতে পারে যে এর সাথে চ্যাট করলে একে কোনো ভাবেই রোবট বলে মনে হবে না। বরং চ্যাটজিপিটির উত্তরগুলোতে অনেক বেশি মানবিক ছোঁয়া থাকে। আর সে কারণেই চ্যাটজিপিটি চালু হবার পর মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে দশ লক্ষ লোক প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করেছে। এবং এক মাসের মাথায় চ্যাটজিপিটির ব্যবহারকারীর সংখ্যা দশ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। চ্যাটজিপিটি কিভাবে কাজ করে এবং কী কারণে এটি এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে সেরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রকল্পে পরিণত হয়েছে, সেই সম্পর্কে আলোচনা করা হবে 'কী কেন কিভাবে'-এর এই পর্বে।
১. চ্যাটজিপিটি: নির্মাতা ও আর্থিক ভিত্তি
চ্যাটজিপিটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই (OpenAI) ২০১৫ সালে যাত্রা শুরু করেছিল। বিশ্ব প্রযুক্তির রাজধানী সিলিকন ভ্যালির বাঘা বাঘা সব উদ্যোক্তা এই প্রকল্পের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে স্যাম অল্টম্যান (Sam Altman) ওপেনএআই এর সিইও (CEO) হিসেবে কর্মরত আছেন। প্রথম দিকে ইলন মাস্কও এই কোম্পানির সাথে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে ইলন মাস্ক ওপেনএআই এর বোর্ড অফ ডিরেক্টরস পদ থেকে সরে যান। শুরুতে কোম্পানিটি ওপেন সোর্স (Open Source) এবং স্বেচ্ছাসেবক প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে মানব জাতিকে উপকৃত করা।
পরবর্তীতে কোম্পানিটি 'ক্যাপড-প্রফিট' (Capped-profit) প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের মালিকেরা ইচ্ছামতো মুনাফা করতে পারে না। তারা কোম্পানির লাভের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করতে পারে। চ্যাটজিপিটি গড়ে তোলার জন্য মাইক্রোসফট (Microsoft) ওপেনএআই এর প্রকল্পে এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছিল। এছাড়া মাইক্রোসফট কম্পিউটার কাঠামো ব্যবহার করে চ্যাটজিপিটির জটিল কম্পিউটিং প্রক্রিয়া সম্পাদনেরও সুযোগ দেওয়া হয়েছিল ওপেনএআইকে। পরবর্তীতে মাইক্রোসফট আরও দশ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে ওপেনএআই এর ৪৬ শতাংশ মালিকানা লাভ করে। ইতিমধ্যে ওপেনএআই প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলারের কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। তারা আশা করছে, ২০৩০ সালেই ২০০ মিলিয়ন ডলার মুনাফা করতে পারবে।
ওপেনএআই এর আগে ডালি-২ (DALL-E 2) নামে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে বাস্তবের মতো ছবি তৈরির প্রযুক্তি গড়ে তুলেছিল। ওপেনএআই তাদের অসাধারণ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স মডেলগুলোর কারণে বিশ্বের সবচেয়ে সেরা উদ্ভাবনী এআই কোম্পানির স্বীকৃতি পেয়েছে।
২. চ্যাটজিপিটির যাত্রা: প্রশিক্ষণ ও কার্যপদ্ধতি
২০২০ সালে ওপেনএআই ট্রান্সফরমার আর্কিটেকচার ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের উপর ভিত্তি করে চ্যাটজিপিটি গড়ে তোলে। চ্যাটজিপিটি ২০২২ সালের ৩০শে নভেম্বর সর্বপ্রথম পরীক্ষামূলকভাবে যাত্রা শুরু করেছিল। এরপর মডেলটির আরও উন্নয়ন সাধন করে ডিসেম্বরের ১৫ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে চ্যাটজিপিটি উন্মুক্ত করা হয়। এটি জনসম্মুখে প্রকাশ করা সর্বপ্রথম বৃহৎ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল। এই সিস্টেমকে মানুষের মতো কথাবার্তা শেখাতে ইন্টারনেট থেকে ৪৫ টেরাবাইট লিখিত তথ্য দিয়ে ১৭৫ বিলিয়ন কথোপকথন ধরনের উপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
চ্যাটজিপিটি মূলত তিনটি ধাপে তার কাজ সম্পাদন করে। ওপেনএআই এই ধাপগুলোকে বলছে:
Collect demonstration data and train a supervised policy.
Collect comparison data and train a reward model.
Optimize a policy against the reward model using the PPO reinforcement learning algorithm.
এই প্রধান ধাপের মধ্যে আবার দশটিরও বেশি ধাপ রয়েছে, যার মাধ্যমে চ্যাটজিপিটি গ্রাহকের কাছ থেকে প্রশ্ন শুনে এবং প্রশ্ন অনুযায়ী সম্ভাব্য একাধিক উত্তর খুঁজে বের করে। সবশেষে গ্রাহকের প্রশ্নের সাথে সর্বোচ্চ সামঞ্জস্যপূর্ণ উত্তরটি পরিবেশন করে। কথোপকথনের গভীরতা বিচারে এই ধাপগুলো সম্পন্ন করতে চ্যাটজিপিটি মাত্র ৬ থেকে ১৫ সেকেন্ড সময় নেয়। এই মডেলকে ট্রান্সফরমার নামের একটি ডিপ লার্নিং (Deep Learning) কাঠামোর অধীনে পরিচালিত করার ফলে বহু তথ্যের ভেতর থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে চ্যাটজিপিটির বিশেষ সক্ষমতা রয়েছে।
৩. চ্যাটজিপিটির বহুমুখী সৃজনশীলতা ও প্রয়োগ
চ্যাটজিপিটির সৃজনশীলতা শুধু কথাবার্তা এবং প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষের মতো গল্প, কবিতা, চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য, এমনকি বিভিন্ন জটিল সফটওয়্যারের কাজ করার মতো কোডও লিখতে পারে। চ্যাটজিপিটিকে দিয়ে সীমাহীন কাজ করিয়ে নেওয়া সম্ভব।
কাস্টমার সার্ভিস, ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট, কনটেন্ট ক্রিয়েশন, ডিজিটাল মার্কেটিং - বিভিন্ন ধরনের কাজে ইতিমধ্যেই এই সেবা ব্যবহৃত হচ্ছে। তাছাড়া চ্যাটজিপিটিকে কাস্টমাইজ করে নিজের সুবিধামতো অনেক ধরনের কাজের জন্য ব্যবহার করা যাবে। চ্যাটজিপিটি বহু কাজে সফলতার পরিচয় দিলেও এখনো পর্যন্ত এটি সম্পূর্ণ নিখুঁত নয়। মানুষের মতোই চ্যাটজিপিটিও বেশ কিছু ভুল করছে। তবে মানুষের সাথে যোগাযোগের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে চ্যাটজিপিটি নিজেকে প্রশিক্ষিত করে। ফলে যত বেশি মানুষ এই প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করবে, চ্যাটজিপিটি সিস্টেম তত বেশি উন্নত হতে থাকবে।
৪. চ্যাটজিপিটির দ্রুত জনপ্রিয়তা ও খরচ
চ্যাটজিপিটির মতো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিপ্লবের মতোই আমাদের দেশের ই-কমার্সেও ঘটে চলেছে এক অভূতপূর্ব বিপ্লব। দেশের সফল ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোর কল্যাণে এখন ঘরে বসেই যেকোনো সেবা ও পণ্য পাওয়া যাচ্ছে খুব সহজেই। এরকমই একটি উদ্যোগ হলো bdbooks.net। বিশেষ করে সকল চাকরি পরীক্ষার বই, ভর্তি প্রস্তুতির বই, যেকোনো শ্রেণীর একাডেমিক বই সহ সকল ধরনের বই স্বল্প মূল্যে স্বল্প সময়ে ঘরে পেতে চাইলে ভিডিও ডেসক্রিপশন এবং পিন কমেন্টে দেওয়া লিংকে গিয়ে বিডি বুকসের ওয়েবসাইটে ঘুরে আসতে পারেন। এছাড়াও ডেসক্রিপশনে দেওয়া লিংকে গিয়ে প্লে স্টোর থেকে ডাউনলোড করে বিডি বুকসের অ্যাপ ব্যবহার করেও যেকোনো বই সহজে অর্ডার করতে পারবেন। বিডি বুকসের ওয়েবসাইটে 'কি কেন টেন' (Ki Keno Ten) কুপন কোডটি ব্যবহার করলে প্রতিটি বইয়ে পাবেন ১০ শতাংশ ডিসকাউন্ট। এছাড়াও প্রতি অর্ডারের সাথে থাকছে আকর্ষণীয় উপহার।
চ্যাটজিপিটি অ্যাডভান্সড মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদমের সাহায্যে বিপুল সংখ্যক তথ্য ও উপাত্ত বিচার বিশ্লেষণ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক সবচেয়ে সেরা ফলাফল তৈরি করে। এর ফলে চ্যাটজিপিটির সাথে কথা বলতে গেলে অথবা তাকে কোনো প্রশ্ন করা হলে মানুষের মতো ভেবেচিন্তে উত্তর দিতে পারে। শুধু একবার প্রশ্নের উত্তর দেওয়াই নয়, পূর্বের আলোচনা মনে রেখে মানুষের মতো দীর্ঘ সময় আলাপ চালিয়ে যাওয়ার মতো দক্ষতাও আছে চ্যাটজিপিটির। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা সকল ধরনের বিষয় চ্যাটজিপিটিকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কারণে এই ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল প্রায় সকল ক্ষেত্রে আলোচনা চালিয়ে যেতে সক্ষম। কনটেন্ট রাইটিং সহ একাধিক কাজে চ্যাটজিপিটি এতটাই নিখুঁত কাজ করে যে সংশ্লিষ্ট খাতের অনেকেই অদূর ভবিষ্যতে তাদের চাকরি হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন। চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে সম্পূর্ণ অ্যাপ, ভিডিও গেম, এমনকি নতুন স্টার্টআপ কোম্পানি গড়ে তোলারও নজির রয়েছে।
এতসব কার্যকারিতার কারণেই চ্যাটজিপিটি চালু হবার পর মাত্র এক সপ্তাহ মধ্যে দশ লক্ষ লোক প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করেছে। নেটফ্লিক্সের এই পরিমাণ ব্যবহারকারী পেতে সময় লেগেছিল ৪১ মাস। ফেসবুকের ১০ মাস এবং ইনস্টাগ্রামের সময় লেগেছিল আড়াই মাস। এছাড়া প্রথম মাসে ৫ কোটি ৭০ লাখ লোক চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করেছে। এবং ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে দেড় মাসের মাথায় চ্যাটজিপিটির ব্যবহারকারীর সংখ্যা দশ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। চ্যাটজিপিটি ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে এর মালিকানা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই এর বহু টাকা খরচ হচ্ছে। এর এক একটি সার্চের জন্য ১ থেকে ৯ সেন্ট খরচ হচ্ছে। এর একটি সার্চের খরচ যদি ৫ সেন্ট করেও ধরা হয়, তাহলে প্রতিদিন গুগলে যে পরিমাণে সার্চ হয়, সেই পরিমাণ চ্যাটজিপিটি সার্চ এর জন্য প্রতিদিন ৪২৫ মিলিয়ন ডলার খরচ হবে। তবে এখনো পর্যন্ত চ্যাটজিপিটি বিনামূল্যে ব্যবহার করা যাচ্ছে।
ফেব্রুয়ারির ১ তারিখ থেকে চ্যাটজিপিটি প্লাস (ChatGPT Plus) নামে এর একটি সাবস্ক্রিপশন প্যাকেজও চালু করা হয়েছে। এর ফলে মাসে ২০ ডলার খরচ করে চ্যাটজিপিটির সেরা অভিজ্ঞতা পাওয়া যাবে। চ্যাটজিপিটি ফ্রি এবং পেইড সার্ভিস এর সুবিধা মূলত একই। তবে যখন এর সার্ভারে অধিক চাপ পড়ে, তখন ফ্রি ভার্সনে খুব একটা ভালো সাড়া পাওয়া যায় না। অন্যদিকে টাকা দিয়ে চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করলে সর্বোচ্চ সংখ্যক ব্যবহারকারী থাকাকালীন সময়েও এর থেকে দ্রুততম সময়ে সেরা উত্তর পাওয়া সম্ভব।
উপসংহার
'বাঙ্গালা কথা' চ্যানেলের ভিডিও যদি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে বেশি বেশি শেয়ার করে অন্যদেরও দেখার সুযোগ করে দিন। পরবর্তী ভিডিও আপলোড হওয়ার সাথে সাথে দেখতে চাইলে 'কী কেন কিভাবে' সাবস্ক্রাইব করে বেল আইকনটিতে ক্লিক করুন।
কীওয়ার্ডস: চ্যাটজিপিটি, ChatGPT, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ওপেনএআই, OpenAI, ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল, মেশিন লার্নিং, ডিপ লার্নিং, ট্রান্সফরমার, স্যাম অল্টম্যান, ইলন মাস্ক, মাইক্রোসফট, ডালি-২, DALL-E 2, এআই প্রযুক্তি, কনটেন্ট ক্রিয়েশন, ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং, এআই বিপ্লব, প্রযুক্তি উদ্ভাবন, কোডিং, স্টার্টআপ, ব্যবহারকারীর সংখ্যা, সাবস্ক্রিপশন, পেইড সার্ভিস, ফ্রি সার্ভিস।
