তিমি কি মানুষকে গিলে ফেলতে পারে? জানুন তিমি গ্রাস করলে বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা কতটা ?

 


তিমি কি মানুষকে গিলে ফেলতে পারে? জানুন তিমি গ্রাস করলে বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা কতটা!

আপনি কি কখনো ভেবেছেন যে, যদি একটি বিশাল তিমি আপনাকে গিলে ফেলে, তাহলে কী হবে? আপনি কি সঙ্গে সঙ্গে মারা যাবেন, নাকি ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাবেন? অথবা কোনো রকম ক্ষত ছাড়াই কি আপনি বেঁচে ফিরতে পারবেন? চলুন, আজকের এই অদ্ভুত প্রশ্নের উত্তরগুলো জেনে নিই।

কল্পনা করুন, আপনি নিজের চোখ ধীরে ধীরে খুলছেন। চোখ খুলেই আপনি নিজেকে একটি অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে এবং বিশ্রী গন্ধযুক্ত জায়গায় পেলেন। আপনার চারিপাশের দেওয়াল যেন নড়াচড়া করছে। এর কারণ হলো, কিছুক্ষণ আগেই আপনাকে একটি তিমি গিলে ফেলেছে এবং আপনি তার পাকস্থলীতে! কিন্তু বাস্তবে কি এমন ঘটনা সম্ভব হতে পারে?

তিমি গ্রাস করলে কি বাঁচা সম্ভব? দাঁতহীন তিমি (বেলিন ওয়েল) বনাম দাঁতযুক্ত তিমি (স্পার্ম ওয়েল)

তিমি গ্রাস করলে আপনার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নির্ভর করে তিমিটি কোন প্রজাতির, তার উপর। তিমি মূলত দুই প্রকারের হয়: দাঁতহীন তিমি (Baleen Whale) এবং দাঁতযুক্ত তিমি (Toothed Whale)।

দাঁতহীন তিমি (বেলিন ওয়েল)

নীল তিমি (Blue Whale) বা হাম্পব্যাক ওয়েল (Humpback Whale)-এর মতো তিমিদের দাঁত থাকে না। এদের মুখ বিশাল হলেও, এদের গলার নালিকা খুবই সরু। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন যে, এই নালিকাগুলো গলফ খেলার বলের আকারের মতো হয়। ফলে, আপনি এদের মুখের ভিতরে যেতে পারলেও, গলায় আটকে যাবেন এবং পাকস্থলীতে পৌঁছাতে পারবেন না। এদের দাঁত না থাকার কারণে আপনার কোনো বড় ক্ষতিও হবে না।

তবে, এই তিমিরা সাধারণত শিকার করার পর সমুদ্রের প্রায় ৬০০ ফুট (২০০ মিটার) গভীরে চলে যায়। ফলে, যদি আপনি তিমির মুখ থেকে বেরিয়েও আসেন, সমুদ্রের এত গভীরে আপনার বেঁচে থাকা কঠিন হবে। তবে, যদি তিমিটি ২০ মিটারের নিচে যায়, তাহলে আপনি দ্রুত সাঁতার কেটে উপরে উঠে আসতে পারবেন এবং বেঁচে যেতে পারেন।

প্রশ্ন হলো, এত সরু নালীর মাধ্যমে এরা খায় কী? নীল তিমি বা অন্যান্য বেলিন ওয়েল প্রচুর পরিমাণে প্ল্যাঙ্কটন খেয়ে তাদের খিদে মেটায়। এরা একবারে প্রায় ৯০ টন জল মুখে নিতে পারে, যার ফলে প্রায় ৫০০ কেজির মতো প্ল্যাঙ্কটন মুখে চলে আসে। অর্থাৎ, এদের মুখে ৫০০ জন মানুষ হেঁটে গেলেও, কাউকে এরা গিলতে পারবে না।

দাঁতযুক্ত তিমি (স্পার্ম ওয়েল)

স্পার্ম ওয়েল (Sperm Whale) হলো একটি দাঁতযুক্ত তিমি। যদি এই তিমি আপনাকে খায়, তাহলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে। এদের দাঁতগুলো প্রায় ২০ সেন্টিমিটার লম্বা হয়, যা রান্নাঘরের ছুরির মতো ধারালো। এদের দাঁতের আঘাতেই আপনার মৃত্যু হতে পারে।

যদি কোনোভাবে আপনি দাঁতের আঘাত না পেয়ে এর মুখের ভেতরে চলে যান, তাহলে এটি আপনাকে গিলে নেবে। এই তিমির গলার নল বেলিন ওয়েলের মতো সরু নয়, ফলে আপনি সহজেই এর পাকস্থলীতে চলে যাবেন।

স্পার্ম ওয়েলের পাকস্থলী: সবার প্রথমে আপনি এর প্রথম পাকস্থলীতে যাবেন, যেখানে প্রচুর পরিমাণে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড (HCl) থাকে। ফলে, যত বেশি সময় থাকবেন, ততই আপনার চামড়া পুড়তে থাকবে। এখানেই শেষ নয়, এই তিমির গরুর মতো চারটি পাকস্থলী রয়েছে! ফলে, আপনি ক্রমে একটি থেকে আরেকটি পাকস্থলীতে যেতে থাকবেন। আর এই প্রতিটি পাকস্থলীতেই প্রচুর HCl থাকে, যার মানে আপনার মাংস সম্পূর্ণভাবে গলে যাবে এবং আপনার অবশিষ্ট হাড়গোড় সেই তিমির মলের সাথে বেরিয়ে যাবে। এক্ষেত্রে আপনার মৃত্যু নিশ্চিত।

তবে, যদি আপনি এই স্পার্ম ওয়েলের পাকস্থলীতে যাওয়ার আগে নিজেকে সামলে নিয়ে কোনোভাবে গলা দিয়ে উল্টোভাবে বেরিয়ে আসতে পারেন, তবে আপনি নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যাবেন। কিন্তু মনে রাখবেন, আপনার বেরিয়ে আসার একটাই রাস্তা – এই তিমির ভয়াবহ ছুরির মতো দাঁত থেকে সতর্কতার সাথে বেরিয়ে আসা। অন্যথায়, তার দাঁতের আঘাতে আপনার মৃত্যু হবে অথবা আপনার হাত-পা কেটে যেতে পারে। এরপর আপনাকে এই হাত-পায়ের সাহায্যেই সাঁতার কেটে জলের উপরে আসতে হবে। যদি আপনি সঠিকভাবে উঠে আসতে পারেন, তবে আপনি এ যাত্রায় বেঁচে যাবেন।

তবে, মনে রাখা ভালো, যদি আপনি কোনো দাঁতাল তিমি যেমন স্পার্ম ওয়েলের মুখে চলে যান, তাহলে বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা একেবারেই কম। কারণ, আমাদের মতো তারাও তাদের খাদ্যকে দাঁত দিয়ে চিবিয়ে খায়।

বাস্তবে কি কখনো কোনো তিমি মানুষকে খেয়েছে?

বাস্তবে তিমি দ্বারা মানুষ গ্রাস করার ঘটনা খুবই বিরল এবং বিতর্কিত।

জেমস বার্টি'র গল্প (১৮৯১)

১৮৯১ সালে জেমস বার্টি নামের একজন ব্যক্তি দাবি করেছিলেন যে, তাকে নাকি একটি স্পার্ম ওয়েল গিলে ফেলেছিল। তিনি বলেছিলেন, যখন তিনি তার সঙ্গীদের সাথে সমুদ্রে যাত্রা করছিলেন, তখন একটি তিমি তাদের জাহাজে আক্রমণ করে। এর ফলে তাদের জাহাজ সম্পূর্ণ ভেঙে যায় এবং তারা সবাই সমুদ্রে পড়ে যান। তখন ওই তিমিটি তাকে গিলে ফেলে।

অনেক পরে তার সঙ্গীরা সেই তিমিটিকে ধরতে পারে এবং তিমিটিকে মেরে তার পেট কেটে তাকে উদ্ধার করে। জেমস দাবি করেন, এই সময়টুকু তিনি তিমির পেটের ভেতরেই ছিলেন। তাকে যখন উদ্ধার করা হয়, তখন তিনি অজ্ঞান ছিলেন, কিন্তু তখনও বেঁচে ছিলেন। তবে তার দেহ ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিল এবং তিনি বমি করেছিলেন।

এই ঘটনা শোনার পর সেই সময়কার অনেক বিশেষজ্ঞ বলেছিলেন যে, এটি তিমির পেটের ভেতরের অ্যাসিডের জন্য হয়েছিল। তবে, আপনার কি মনে হয় জেমস যে গল্পটি বলেছিলেন, সেটা বাস্তবেই সত্যি নাকি কাল্পনিক? আমরা আগেই জেনেছি যে, দাঁতযুক্ত তিমির পাকস্থলীর অ্যাসিডে কিছুক্ষণ থাকার পর চামড়া গলে যাওয়ার কথা এবং দেহ হজম হয়ে হাড়গোড় পায়ু দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার কথা। ফলে, তার মৃত্যু নিশ্চিত। এর মানে, জেমস সম্ভবত সেই সময়ের মানুষদের বোকা বানিয়েছিলেন।

মাইকেল প্যাকার্ড'র ঘটনা (২০২১)

বর্তমান যুগে মাইকেল প্যাকার্ড নামের আরও একজন ব্যক্তি দাবি করেছেন যে, তাকে একটি হাম্পব্যাক ওয়েল নামের একটি তিমি গিলে ফেলেছিল। এই তিমি হলো বেলিন ওয়েল, মানে দাঁতহীন তিমি। এই তিমিটি তাকে গিলে নিতে পারেনি এবং লোকটির কাছে অক্সিজেন ট্যাঙ্ক থাকার জন্য তার কোনো রকম শ্বাসকষ্ট হয়নি। তিনি এরপর সুযোগ পেয়ে তিমির মুখ থেকে বেরিয়ে আসেন এবং কোনো রকম সাঁতার কেটে সমুদ্রের উপর চলে আসেন। এরপর বহু কষ্টে তিনি তীরে সফল হন। উল্লেখযোগ্য যে, তার গুরুতর কোনো সমস্যাই হয়নি, তবে কিছু ত্বকের সমস্যা এবং ছোটখাটো কিছু আঘাত দেখা যায়। এরপর তিনি হাসপাতালে কিছুদিন ভর্তি থাকেন। একজন ডুবুরিও এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

এই ঘটনাগুলি সত্যি না মিথ্যা, তা কেবলমাত্র তারাই জানেন। তবে, মাইকেল প্যাকার্ডের ঘটনাটি সত্যি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, কারণ হাম্পব্যাক ওয়েল দাঁতহীন তিমি এবং তাদের গলার নালী সরু।

উপসংহার

যদি আমাদের কোনো দাঁতযুক্ত তিমি গিলে ফেলে, তবে আমাদের সেখান থেকে বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা খুবই কম বা প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু যদি বেলিন ওয়েল (দাঁতহীন তিমি) আমাদের গিলে ফেলে, তবে এক্ষেত্রে আমাদের বাঁচার সম্ভাবনা একটু বেশি।

বন্ধুরা, আজকের ভিডিওটি এইটুকুই। যদি ভালো লেগে থাকে, তবে অবশ্যই লাইক করবেন, বন্ধুদের সাথে শেয়ার করবেন এবং অদ্ভুত দশ চ্যানেলে নতুন হলে অবশ্যই সাবস্ক্রাইব করে বেল আইকনটিতে প্রেস করে নেবেন, এরকমই ইন্টারেস্টিং ভিডিও সবার আগে দেখতে।

কীওয়ার্ডস: তিমি, তিমি গ্রাস, তিমি গিলে ফেললে, স্পার্ম ওয়েল, বেলিন ওয়েল, মাইকেল প্যাকার্ড, জেমস বার্টি, তিমি হামলা, তিমি পেটে, তিমি থেকে বাঁচা, সমুদ্রের রহস্য, শিক্ষামূলক, অজানা তথ্য, কি কেন কিভাবে, বিজ্ঞান।

নবীনতর পূর্বতন

نموذج الاتصال