উড়ন্ত গাড়ির ভবিষ্যৎ: যানজটমুক্ত পৃথিবীর ৭টি অত্যাধুনিক উড়ন্ত গাড়ি!
বন্ধুরা, চাকা আবিষ্কারের পর থেকে যাতায়াতের সহজ মাধ্যম হিসেবে স্থলযানের চাহিদা বেড়েই চলেছে। মানুষের চাহিদা অনুসারে বৃদ্ধি পেয়েছে গাড়ির সংখ্যা। অন্যদিকে, গাড়ি চলাচলের জন্য বৃদ্ধি পেয়েছে রাস্তাঘাট। আধুনিক সময়ে এসে এই চাহিদা এতটাই অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় এসে ঠেকেছে যে, অতিরিক্ত গাড়ির জন্য পর্যাপ্ত রাস্তা তৈরি আর সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সারা পৃথিবী জুড়ে দেখা যাচ্ছে ভয়াবহ যানজট। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য গাড়ির কোম্পানিগুলো অভিনব সব গাড়ি তৈরির পায়তারা নিচ্ছে। তেমনই একটি প্রচেষ্টা হলো উড়ন্ত গাড়ি।
উড়ন্ত গাড়ি এমন এক ধরনের গাড়ি যা সাধারণ গাড়ির মতোই চালানো যাবে। তবে যানজটের কবলে পড়ে একটি সুইচ চেপেই গাড়িটিকে আপনি আকাশযানে রূপান্তর করতে পারবেন। ভেবে দেখুন তো, যানজট কবলিত এলাকা থেকে আপনি উড়াল দিয়ে কাঙ্খিত জায়গায় চলে যাচ্ছেন! আজকের ভিডিওতে এমন সব আশ্চর্যজনক সাতটি গাড়ির সম্পর্কে আলোচনা করা হবে, যা যোগাযোগ ব্যবস্থার ভবিষ্যৎকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে চলেছে।
তো চলুন, শুরু করা যাক আজকের ভিডিও!
১. টেরাফুজিয়া টিএফ-এক্স (Terrafugia TF-X)
টেরাফুজিয়া কোম্পানির আরেকটি উড়ন্ত গাড়ির নাম হলো টেরাফুজিয়া টিএফ-এক্স। এই গাড়িটির পাখায় সংকুচিত থাকা প্রোপেলার (Propeller) উড়াল দেওয়ার আগে হেলিকপ্টারের পাখার মতো ছড়িয়ে পড়ে। গাড়ির নির্মাতারা দাবি করেছেন, গাড়িটিকে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে যে কেউ একে ব্যবহার করতে পারে। তবে উড়ন্ত গাড়ি ব্যবহারের জন্য আলাদা লাইসেন্সের দরকার হবে।
গাড়িটির রয়েছে হাইব্রিড পাওয়ারট্রেন (Hybrid Powertrain), যা গাড়ির চাকাকে সঠিকভাবে চালনা করতে সহায়তা করবে। একই সাথে দুইটি বিশেষ ইলেকট্রিক রাউটারও (Electric Router) রয়েছে, যেগুলোর সাহায্যে গাড়িগুলো সহজেই উড়তে পারে। উড়াল দেওয়ার জন্য গাড়িটির কোনো রানওয়ের (Runway) দরকার পড়ে না। গাড়িটি ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটার গতি তুলতে পারে। একই সাথে এটি টানা ৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে পারে। অর্থাৎ, মাত্র তিন ঘণ্টায় আপনি জেনেভা থেকে লন্ডনে উড়াল দিতে পারবেন এই গাড়িতে চড়ে। অন্যান্য উড়ন্ত গাড়ির সাথে এটির অমিল হলো এই গাড়িটি চার আসনবিশিষ্ট। সুন্দর নকশায় তৈরি এই গাড়িটি যোগাযোগের এক নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে।
২. পাল-ভি লিবার্টি (PAL-V Liberty)
নেদারল্যান্ড ভিত্তিক গাড়ির এই কোম্পানিটি প্রায় বিশ বছর যাবত গবেষণা চালিয়ে আসছে। তাদের গবেষণার বিষয় এমন একটি গাড়ি তৈরি করা, যা ব্যক্তিগতভাবে স্থল এবং আকাশ দুই পথেই ব্যবহার করা যাবে। তারই ধারাবাহিকতায় পাল-ভি লিবার্টি নামের এই গাড়িটি ইতিমধ্যে বাজারে এসেছে।
গাড়িটির রয়েছে ২০০ হর্স পাওয়ারের শক্তিশালী ইঞ্জিন এবং প্রোপেলার। তবে অন্যান্য উড়ন্ত গাড়ির সাথে এটির অমিল হলো গাড়িটি তিন চাকা বিশিষ্ট। গাড়িটি স্থল এবং আকাশ দুই পথেই সর্বোচ্চ ১৮০ কিলোমিটার গতি তুলতে সক্ষম। উড়ন্ত অবস্থায় গাড়িটি প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৭ গ্যালন জ্বালানির প্রয়োজন হয়। আর এই পরিমাণ জ্বালানি পুড়িয়ে গাড়িটি ৩১১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সক্ষম। অর্থাৎ, প্রতি গ্যালন ফুয়েলে গাড়িটি অতিক্রম করতে পারে ৩১ মাইল। পাল-ভি এর বেশ কয়েকটি মডেল বাজারে রয়েছে। তার মধ্যে লিবার্টি স্পোর্ট মডেলটির দাম প্রায় ৪ লক্ষ মার্কিন ডলার। আর লিবার্টি পাইওনিয়ার মডেলটির দাম প্রায় ৬ লক্ষ মার্কিন ডলার।
৩. এরোমোবিল (AeroMobil)
এরোমোবিল নামের মনমুগ্ধকর এই গাড়িটি দিয়েই শুরু করা যাক। এই গাড়িটি বাস্তবিক অর্থেই উড়তে পারে। গাড়ি চালিয়ে উড়ে যাওয়া যে রূপকথা নয়, সেটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে এরোমোবিল। আপনি যদি এই গাড়ির নকশার দিকে আলোকপাত করেন, তবে বলতে বাধ্য হবেন এটি একটি সুন্দরতম শিল্প।
স্থল এবং আকাশ দুই পথেই আপনাকে সেবা দিতে পারবে এই গাড়িটি। স্থলপথে গাড়ির গতি ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার। মাত্র তিন মিনিট সময়ের ব্যবধানে এই গাড়িটি উড়াল দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে পারে। আকাশ পথে ঘণ্টায় ২৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সক্ষম এই গাড়িটি আপনিও চালাতে পারবেন। তবে তার আগে আপনাকে বিমান চালকের লাইসেন্স সংগ্রহ করে নিতে হবে।
৪. টেরাফুজিয়া ট্রানজিশন (Terrafugia Transition)
২০১২ সালে নিউ ইয়র্কে একটি অটো শোতে টেরাফুজিয়া ট্রানজিশনের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এবং এখানেই দেখা যায়, ব্যক্তিগত উড়ন্ত গাড়ি এখন আর অসম্ভব কোনো বিষয় নয়। পরবর্তীতে গাড়িটি তার কর্মদক্ষতায় বেশ কয়েক ধাপ এগিয়েছে। এখন চাইলেই আপনি গাড়িটি কিনে ফেলতে পারবেন। তবে এই জন্য খরচ করতে হবে প্রায় ৪ লক্ষ মার্কিন ডলার। সেই সাথে বিমান চালকের লাইসেন্সও লাগবে।
চার চাকা এবং দুই আসন বিশিষ্ট এই গাড়িটির রয়েছে ভাঁজ করার উপযোগী দুইটি পাখা। এটি ব্যবহার করে আকাশ পথে ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত গতি তোলা যায়। স্থল এবং আকাশ পথের জন্য আলাদা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে গাড়িটিতে। মজার ব্যাপার হলো, মাত্র এক মিনিটেই রাস্তায় চলতে চলতে গাড়িটি নিয়ে উড়াল দেওয়া যায়।
৫. ক্লিন ভিশন এয়ার কার (Klein Vision AirCar)
২০২০ সালের অক্টোবরে প্রকাশ পাওয়া একটি ভিডিও চিত্রে এই গাড়িটির প্রথমবার আকাশে ওড়ার দৃশ্য দেখা গেছে। চার চাকা বিশিষ্ট এই গাড়িটিতে রয়েছে মাত্র দুইটি আসন। এয়ার কারের আকাশে উড়াল দিতে একটি রানওয়ের প্রয়োজন। উড়াল দেওয়ার আগে গাড়িটির পেছনের ভাগ কিছুটা প্রসারিত হয়, যাতে পাখা দুটি স্বাচ্ছন্দ্যে নাড়ানো যায়।
এটির রয়েছে ছয় সিলিন্ডার বিশিষ্ট শক্তিশালী ইঞ্জিন, যার ওজন প্রায় ২৪০০ পাউন্ড। ইঞ্জিনটি ম্যানুফ্যাকচার করেছে বিখ্যাত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিএমডব্লিউ (BMW)। কোম্পানিটি দাবি করেছে যে, গাড়িটি আকাশপথে ঘণ্টায় ১৯০ কিলোমিটার গতি তুলতে পারবে। আর এটি টানা ৬০০ কিলোমিটার উড়ে যেতে সক্ষম।
৬. এয়ারবাস পপ-আপ (Airbus Pop.Up)
প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে অডি (Audi) এবং ইটাল ডিজাইন (Italdesign) এর যৌথ প্রজেক্ট হলো এয়ারবাস পপ-আপ। গাড়িটির নকশা এমনভাবে করা হয়েছে যেন যাত্রীরা খুব সহজেই এটি ব্যবহার করতে পারেন। যাত্রী একটি অ্যাপের মাধ্যমে গাড়িটি বুক করতে পারবেন। এই অ্যাপ সবচেয়ে দ্রুততম পথে যাত্রীকে গন্তব্যে পৌঁছাতে সহায়তা করবে।
প্রথমত, এটি আপনাকে স্থলপথে গন্তব্যে নিয়ে যেতে চেষ্টা করবে। স্থলপথ জটিল হলে গাড়িটি আপনাকে নিয়ে উড়াল দিবে নির্ধারিত গন্তব্যে। যাত্রীদের বসার জায়গাটি কার্বন ফাইবার (Carbon Fiber) দিয়ে তৈরি। রোটার প্রোপালশন সিস্টেম (Rotor Propulsion System) দ্বারা গাড়িটির এয়ার মডিউল নিয়ন্ত্রিত হয়। বর্তমানে গাড়িটি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের দ্বারপ্রান্তে। এই গাড়িটি বাজারে আসলে যোগাযোগ ব্যবস্থার এক নতুন অধ্যায় উন্মোচিত হবে।
৭. ম্যাভেরিক ফ্লাইং কার (Maverick Flying Car)
এই গাড়িটি মোটেও জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করা হয়নি। অন্য সকল উড়ন্ত গাড়ির মতো ম্যাভেরিকের পাখা নেই। তবে এর রয়েছে প্যারাসুটের মতো স্যুট। গাড়িটি আমেরিকার ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (Federal Aviation Administration - FAA) দ্বারা অনুমোদিত। সেদিক থেকে এটি সম্পূর্ণ বৈধ একটি উড়াল যান।
২.৫ লিটার সুবারু (Subaru) ইঞ্জিন গাড়িটিকে শক্তিশালী করেছে। ইঞ্জিনটির শক্তিমত্তা ১৯০ হর্স পাওয়ার। এই গাড়িটি ঘণ্টায় ৬৪ কিলোমিটার গতি তুলতে সক্ষম। গাড়িটির উড়াল দিতে কমপক্ষে ৩০০ মিটার দীর্ঘ রানওয়ের প্রয়োজন। গাড়িটির পেছনে পাঁচটি ব্লেড সম্বলিত প্রোপেলারও রয়েছে, যার ফলে খুব সহজেই আকাশ পথ ব্যবহার করে গন্তব্যে পৌঁছানো যায়। একটি মাত্র বাটন চাপ দিয়েই আপনি এই গাড়িটিকে উড়ানোর জন্য প্রস্তুত করতে পারেন।
উপসংহার
উড়ন্ত গাড়ির এই ধারণা একসময় কেবল বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর অংশ ছিল, কিন্তু এখন তা বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। যানজটমুক্ত শহর, দ্রুত যাতায়াত এবং ব্যক্তিগত পরিবহনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে এই প্রযুক্তি। যদিও এর ব্যবহারিক দিক এবং নিরাপত্তার বিষয়গুলো এখনও আলোচনার বিষয়, তবে নিঃসন্দেহে বলা যায়, ভবিষ্যতের যোগাযোগ ব্যবস্থায় উড়ন্ত গাড়ির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে।
তো বন্ধুরা, কেমন লাগলো আজকের ভিডিও? আশা করছি অনেক ভালো লেগেছে। যদি ভালো লেগে থাকে, ভিডিওতে লাইক করুন। বাঙ্গালা কথা চ্যানেলকে সাবস্ক্রাইব করুন। দেখা হচ্ছে নতুন ভিডিওতে। ততক্ষণ পর্যন্ত ভালো থাকবেন। ধন্যবাদ।
কীওয়ার্ডস: উড়ন্ত গাড়ি, ফ্লাইং কার, যানজট, ভবিষ্যৎ পরিবহন, টেরাফুজিয়া টিএফ-এক্স, পাল-ভি লিবার্টি, এরোমোবিল, টেরাফুজিয়া ট্রানজিশন, ক্লিন ভিশন এয়ার কার, এয়ারবাস পপ-আপ, ম্যাভেরিক ফ্লাইং কার, ব্যক্তিগত পরিবহন, আকাশযান, প্রযুক্তির অগ্রগতি, স্মার্ট সিটি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, উদ্ভাবন, বিমান চালকের লাইসেন্স, হাইব্রিড পাওয়ারট্রেন, প্রোপেলার, রানওয়ে।
